Tuesday, June 7, 2022

দ্য হাঙ্গার আর্টিস্ট

Is starvation a performing art? এ নিয়ে তর্ক বিতর্ক বহুযুগ ধরে চলে আসছে। তবে ঊনবিংশ শতাব্দী এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক অবধি 'হাঙ্গার আর্টিস্ট'রা পারফর্মার-ই ছিলেন কারণ তারা টাকার বিনিময়ে মানুষের মনোরঞ্জন করতেন। কিন্তু তাদের মনোরঞ্জনের পদ্ধতিটি ছিল অভিনব। তারা খাঁচার মধ্যে একটি চেয়ারে বসে দীর্ঘদিন উপবাস করতেন এবং সেটি দেখতে দর্শকরা টাকা খরচ করে ভিড় জমাতেন। এমনকি রাতেও দর্শক সমাগম হতো। ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে এই অ্যাক্ট খুবই জনপ্রিয় ছিল। যত বেশিদিন একটানা উপোষ (৪০ দিনের বেশি নয় যদিও) করে থাকতে পারবে, তত বেশি ভিড় ও টাকা। এই হাঙ্গার আর্টিস্টদের সাথে আমরা পরিচিত হয়েছিলাম ফ্রানৎজ কাফকা'র বিখ্যাত ছোটগল্প "আ হাঙ্গার আর্টিস্ট" - এর (১৯২২) মাধ্যমে। ১০০ বছর পর কাফকা'র এই বিখ্যাত ছোটগল্পটি অবলম্বনে পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় (Kamaleswar Mukherjee) বানালেন স্বল্পদৈর্ঘ্যের বাংলা চলচ্চিত্র "দ্য হাঙ্গার আর্টিস্ট"।

বর্তমান পুঁজিবাদ (capitalism) সর্বস্ব সমাজে বাজার অর্থনীতি (market economy) কিভাবে একজন শিল্পীর অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ (control) করে, সেটাই সিনেমাটির মূল বক্তব্য। ছবির মূল চরিত্র দুই তরুণ বন্ধু - ভূতো আর ঘনা। ভূতো রাজনৈতিক ভাবে সচেতন একজন তরুণ যে সমসাময়িক বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর খবরাখবর রাখে। বিশ্বের যে প্রান্তেই কোনো সন্ত্রাস বা অত্যাচারের ঘটনা ঘটুক না কেনো, ভূতো তার প্রতিবাদে অনশন করে এবং ভূতো বেশ কয়েকদিন না খেয়ে থাকতে পারে। ঘনা ভূতোর এই অনশন করার ক্ষমতাকে মূলধন (capital) করে মুনাফা (profit) করবে ঠিক করে এবং সেইমতো ভূতোকে ক্রমাগত বোঝাতে থাকে যে ঠিকমতো প্রচার ও প্রোপাগান্ডা পেলে অনশনও বাজারে বিক্রি হয়। আর সেটা করতে পারলে ভূতো সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে একজন শিল্পী হিসেবে - 'অনশন শিল্পী'! এই সমাজে সবাই চায় মনোযোগ পেতে - ভূতো ঘনার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। ঘনা ভূতোকে নিয়ে শো আয়োজন করে এবং সেই শো চারদিকে শোরগোল ফেলে দেয়। প্রচারের সমস্ত আলো তখন ভূতোর ওপর। মূলস্রোত সংবাদমাধ্যম থেকে সামাজিক মাধ্যমে তখন শুধুই চর্চার বিষয় ভূতোর অনশন শো। চারদিকে ভূতোকে নিয়ে বিজ্ঞাপন। একটি শো থেকে পরের শো তে ভূতোর অনশন করার দিন সংখ্যা বাড়তে থাকে - মিডিয়া আরো বেশি মাতামাতি করে। কর্পোরেট দুনিয়ার কর্তার চিন্তা "ভূতো ২% ভোট সুইং করাতে পারে!" ভূতো ততদিনে নিজেকে পুরোদস্তুর একজন শিল্পী অর্থাৎ 'অনশন শিল্পী' ভাবতে শুরু করে দিয়েছে এবং প্রচার মাধ্যমের আলোয় থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। অনশনের ১৮ দিনের মাথায় যখন ভূতোর মা ভূতোর প্রিয় খাবার নাড়ু নিয়ে আসেন, ভূতো বলে সে "ভাবের ঘরে চুরি করতে পারবেনা " কারণ সে "একজন প্রকৃত শিল্পী"। ভূতোকে ভালোবেসে যখন এক মহিলা সাংবাদিক ভূতোকে নিজের কথা ভাবতে বলে, যখন ভূতোকে বলে যে "stop this madness", ভূতো তাকেও তাড়িয়ে দেয়। ভূতোর মাথায় তখন ২০ দিন না খেয়ে থাকার ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করে প্রকৃত অনশন শিল্পী হওয়ার প্রবল বাসনা! দ্য আর্ট অব হাঙ্গারে ভূতো তখন মোহগ্রস্ত! কিন্তু বাজারের নিয়মেই ভূতোর শো তে দর্শক সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে থাকে, মিডিয়া কভারেজ কমে আসে, বিজ্ঞাপনও কমতে থাকে - ফলে ঘনার মুনাফাও কমতে থাকে। ঘনা ভূতোকে বলে অনশন পাবলিক আর খাচ্ছে না! ঘনার মাথায় তখন নতুন কোন চমকের ভাবনা যা বাজারে খাবে! ঘনা একজন ঘুম শিল্পীর (slumber artist) খোঁজ পেয়ে যায় যে কোনোরকম মদ্যপান ছাড়াই ৭২ ঘন্টা ঘুমিয়ে থাকতে পারে। অতএব ভূতোর প্রয়োজন ফুরিয়েছে। ভূতোর ওপর প্রচারের আলো আচমকাই নিভে যায়। শেষ দৃশ্যে ভূতোর হৃদয়বিদারক চিৎকার "লাইট, লাইট - আমি একজন প্রকৃত শিল্পী - আমি একজন প্রকৃত শিল্পী" বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে দেয়।

ভূতোর চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী অনবদ্য। ঘনার চরিত্রে বিশ্বনাথ বসু বেশ ভালো। সাংবাদিক চরিত্রে প্রিয়াঙ্কা মন্ডল মনে দাগ কাটে। ১৮ মিনিটের একটু বেশি সময়ের "দ্য হাঙ্গার আর্টিস্ট" মাস দেড়েক আগে ইউটিউবে রিলিজ করেছে। ইতি মধ্যেই বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র উৎসবে (international short film festival) ছবিটি দেখানোও হয়েছে। ধন্যবাদ কমলেশ্বর বাবু ও ফ্যাটফিশ এন্টারটেনমেন্ট কে এরকম একটি ছবি বানানোর জন্য। সিনেমাটি দেখবার ইউটিউব সংযোগসূত্রটি নিচে দেওয়া থাকলো।

https://youtu.be/05fbZhfIYtM

সুমন সিনহা 
০৭/০৬/২০২২



Monday, February 21, 2022

আ-মরি বাংলা ভাষা…

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তথা ভাষা শহীদ দিবস । বাঙালি স্বভাবত স্মৃতিমেদুর, হুজুগে ও উৎসবমুখর। তাই আজ হাহুতাশ ও আদিখ্যেতার উদযাপন একটু বেশিই হবে ।  একই সাথে  আমরা যে বাংলায় ভাবতে ভুলে যাচ্ছি ক্রমশ, সেটা আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে আজকেও একই ভাবে প্রকাশ পাবে । বুলেট বিদ্ধ ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায় আমাদের স্মৃতিতে ধূসর হয়ে যাওয়ার জন্য যতটা না লজ্জিত আমরা, তার চেয়ে বেশি গর্বিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক হওয়ার চক্ষুলজ্জাহীন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে । নিজেদের উত্তরাধিকার, নিজেদের সংস্কৃতি কে অনাদরে, অবহেলায় দূরে সরিয়ে রেখে কি অন্যদের সংস্কৃতি কে কখনো আপন করে নেওয়া যায় ? ভাষা একটা জাতির পরিচয় (identity), ভাষা সেই জাতির সংস্কৃতির ধারক ও বাহক । সেই ভাষা বাবহারের প্রতি আমরা যদি শ্রদ্ধাশীল না হই, যত্নবান না হই, ভাষার প্রতি আমরা যদি উদাসীন হই, তাহলে অন্যরা তো সম্মান দেবেই না, বরং আমরা আরো শিকড়হীন হয়ে পড়বো । সেই শিকড়হীন হয়ে যাওয়ার হতাশা অন্যের সংস্কৃতিকে আপন করে নেওয়ার খোঁড়া অজুহাত না হয়ে দাঁড়ায় ! ভাষা বাবহারে আঞ্চলিক হওয়া কখনো সংকীর্ণতা বা অনগ্রসরতা  বা অনাধুনিকতা বা প্রাদেশিকতা বোঝায় না । এই বোধ টা হওয়া বা শেখানো জরুরী । বাংলা শব্দের সাথে হিন্দি বা ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে কিম্ভুতকিমাকার উচ্চারণ করে যদি আমরা “গ্লোবাল” হওয়ার আত্মসন্তুষ্টিতে ডুবে থাকি, তাহলে সেখানে কোন “গ্লো” থাকেনা । সরস্বতী পুজোর দিন যখন শুনি “ আন্টি প্রসাদ বাটছে” বা “আখ চিবোতে গিয়ে দাঁত হিলছে”, তখন বড় অসহায় লাগে । বিজ্ঞাপনে হাসিমুখে জনপ্রিয় নায়ক যখন বলে “অকলমন্দ হোন, সঠিক বাছাই করুন” বা ফরচুন বাসমতী চালের বিজ্ঞাপনে যখন লেখা থাকে “জড়িয়েনা ধরা দানা” বা “উত্তম মেলে ধরে” তখন দুঃখ আর ক্ষোভ হয় এটা ভেবে যে বাংলা ভাষা কে কতটা সস্তা করে দিলে কোম্পানীগুলো এমন বাংলা লিখেও পার পেয়ে যায় ! আর যে ভাষার দৌলতে গোটা পৃথিবী একটা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপহার পেল, সেই বাংলা ভাষার প্রতি কতটা উদাসীন, কতটা নির্লিপ্ত হলে একটা জাতি বিজ্ঞাপনের এজাতীয় বাংলা ভাষার প্রয়োগ দেখেও প্রতিবাদহীন হয়ে “বিন্দাস” দিন কাটিয়ে যায় ! এরকম অজস্র, অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়, কিন্তু শুধু উদাহরণ দেওয়াটা এই লেখার উদ্দেশ্য নয় । বাংলা ভাষা ও তার বাবহারের প্রতি সচেতন হওয়া আজকের দিনে ভীষণই জরুরী, ভীষণই প্রয়োজনীয় ।  বাংলা বানান ও উচ্চারণ নিয়ে কিছু সংখ্যক লোকজনের মধ্যে যে উন্নাসিকতা এবং “এলিটিস্ট অবসেসন” আছে, তা কাম্য নয় । বাংলা বানান ও উচ্চারণের শুদ্ধতা নিশ্চয়ই দরকার, কিন্তু এই মুহুর্তে তার চেয়েও বেশি দরকার বাংলা ভাষাটা কে তার অবলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো । আজ আত্মসমালোচনার দিন, আজ আত্মবিস্মৃতির অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসার দিন । দেরী হয়ে গেলেও আজ আমাদের ভাবতে হবে উত্তর প্রজন্মকে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে আমরা কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছি ।  যদি সেই দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন না করার চেষ্টা করি, পরবর্তী প্রজন্মকে শিকড়হীন করে দেওয়ার দায়ও আমাদেরই নিতে হবে ।  একুশের আবেগে ভাসবার সাথে সাথে এটাও মনে রাখতে হবে যে একুশ একটা অধিকার, একুশ একটা অঙ্গীকারের নাম ।

গতবছরের লেখাটির সংযোগসূত্রটিও নীচে দিলাম । পড়ে দেখবার অনুরোধ রইলো ।  আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইলো, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা তাদেরও যাদের “বাংলাটা ঠিক আসেনা”। ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি ।

নীচের ছবিটি আমার পুত্র আজ এঁকেছে। 

সুমন সিনহা
২১ / ০২ / ২০২২

গতবছরের লেখার সংযোগসূত্র





Saturday, February 5, 2022

সরস্বতী পুজো - হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো

কোনো কোনো দিন বড় স্মৃতিমেদুর করে তোলে। আজ সরস্বতী পুজো। ভালোবাসার বসন্ত পঞ্চমী। আজকের দিনটি  আমায় অতীতচারী করে তোলে। মফস্বল শহরের সরস্বতী পুজোর দিন মানেই কত রোমাঞ্চকর অনুভূতি... বাড়ির বাইরে থাকার অগাধ স্বাধীনতা। পাড়ার পুজো, স্কুলের পুজো, অন্য স্কুলে ঠাকুর দেখতে যাওয়া, কুল খাওয়ার মজা -- একটার পর একটা। আড়ম্বরহীন পুজোয় অনাবিল আনন্দের অনুভূতি, অকারণ হাসির দিনগুলি আজ চেষ্টা করেও ফিরে পাই না। একটু বড় বয়সে মেয়েদের হলুদ শাড়ি, সাজগোজ, ক্ষেত্রবিশেষে বাঁকা চাহনি, মুখ টিপে হাসি, বন্ধুদের প্রপোস, কারোর কারোর নিরালায় উষ্ণতা বিনিময় ও আমাদের পাহাড়া দেওয়া (কখনো কখনো আড়ি পাতাও বটে! ) -- এসবই এক মনখারাপ করা অদ্ভূত ভালোলাগার সৃষ্টি করে। অকৃত্রিম সারল্যের সেই গলাগলির দিন গুলোই বোধহয় জীবনের সবচেয়ে বড় পাওনা। সঞ্চয়ও বটে। বছর দুয়েক আগে নিছকই খেয়াল থেকে নিচের কবিতা টি লিখেছিলাম। আজ আরো একবার ভাগ করে নিই।

খেয়াল

দুপুর বেলায় হঠাৎ খেয়াল হলো 
ঘুরে আসি সব পুরোনো অলি গলি 
অবক্ষয়ের পঁচিশ বছর পর 
কেমন আছে ফেলে আসা দিন গুলি। 

রোজ বিকেলে আড্ডা দেওয়ার নেশা 
ছুটে যেতাম তোদের বাড়ির ছাদে 
কখনো সেই কোণের ঘর টা তে 
সময় যেতো নিজের মনে বয়ে। 

ঘড়ি দেখার ছিল না কোনো বালাই 
রেশারেশির ছিল না কোনো লড়াই 
লাভ ক্ষতি তে ছিল না যে বিশ্বাস 
শুধু তুই আর আমি, আর ওই ছাদ। 

না ছিল ফোন, না কিছু ভেবে 
দিতিস উঁকি আমার ঘরে 
বলতিস তুই এক গাল হেসে 
চল ঘুরে আসি গঙ্গার ধারে।

দুটো সাইকেল পাশাপাশি চলে 
উৎসাহী লোক চোখাচোখি করে 
আমরা দুজন নির্বিকার 
চষে ফেলি সব রাস্তা ঘাট। 

ছিল না কোনো হিসেবনিকেশ 
ছিল না কোনো বিধিনিষেধ 
চেনা গন্ডির মধ্যে থাকা, ছিল স্বতঃসিদ্ধ
কাঁচা বয়সের দুটি কচি মন, শুধু অপাপবিদ্ধ।

সুমন সিনহা 
০৫/০২/২০২২


Sunday, January 23, 2022

Subhas Chandra Bose – His Ideas, Ideals and Dreams

            The recent past has witnessed the rise of right-wing forces. The attempt to appropriate the icons of freedom struggle by the right-wing forces is quite obvious now-a-days and it has been observed in the recent past, too. This is obviously due to the lack of any heroic figures of their own. However, it is not easier to change the narrative of the thoughts and philosophy of Subhas Chandra Bose and his political legacy. It has to be kept in mind that the life and works of Subhas Chandra Bose are well documented and there is a Netaji Research Bureau, founded by his nephew Dr. Sisir Kumar Bose and presently run by his grandnephew Dr. Sugata Bose. The Netaji Research Bureau is housed at Netaji Bhawan, Kolkata, which is the ancestral house of Subhas Chandra Bose.

               It is of quite relevance today to remind ourselves of his thoughts, ideas, ideals, sacrifices and convictions in India’s struggle for freedom, collected from the most reliable and authentic sources. Let us glance over the pages of history.

“Communalism has raised its ugly head in an all out nakedness…Even the oppressed, the poor and the ignorant long for independence. We hear voices of Hindu Raj in India owing to a majority of Hindu population. These are all useless thoughts. Do the communal organizations solve any of the problems confronted by the working class? Do any such organizations have any answer to unemployment and poverty?... The ideas of Savarkar and Hindu Mahasabha of anti-Muslim propaganda in practice means full collaboration with British” (Source: Netaji Collected Works, Volume – III, Edited by Sisir K Bose, Published by Netaji Research Bureau, 1981)

“Fanatism is the greatest thorn in the path of cultural intimacy and there is no better remedy for fanatism than secular and scientific education.” (Source: The Essential Writings of Netaji Subhas Chandra Bose, Edited by Sisir K Bose and Sugata Bose, Oxford University Press, 2014)

            It is also important to note down here a short excerpt from Sugata Bose’s book ‘His Majesty’s Opponent: Subhas Chandra Bose and India’s struggle Against Empire’ ---- “Netaji successfully united Hindus, Muslims, Sikhs and Christians in the struggle for freedom based on his commitment to equal rights and respect for all as well as his enlightened philosophy of cultural intimacy among India’s diverse communities. He won the implicit trust of the minorities as no one else had…Just as Gandhian values cannot be reduced to a cleanliness campaign, extolling Netaji’s military heroism sounds hollow if divorced from his unequivocal commitment to religious harmony.”

History had been witness to the fact that exactly a week before his assassination on January 30, 1948, Mahatma Gandhi observed Subhas’s birthday and in his final eulogy to the great patriot, Gandhi reminded the nation that Subhas “knew no provincialism nor communal differences” and “had, in his brave army, men and women drawn from all over India without distinction and evoked affection and loyalty, which very few have been able to evoke”.

Commemorating Subhas Chandra Bose on his birth anniversary by garlanding his bust or by erecting his statue will relegate him only. Instead, a proper tribute to Subhas Chandra Bose would be to spread and follow the ‘rich inheritance of ideas, ideals and dreams’, left by Bose. It is an eternal truth that the legacy of Subhas Chandra Bose lies in his ‘generous and imaginative approach towards achieving unity by respecting difference.’

Suman Sinha
23/01/2022


Sunday, December 5, 2021

একটি কাল্পনিক কথোপকথন

 অতীত: কেমন আছিস? চিনতে পারছিস?

বর্তমান: তুই ছিলিস বলেই তো আমি আছি। তাই চিনতে পারব না কেন?

অতীত: কেমন আছিস বললি না তো?

বর্তমান: এই বেশ ভাল আছি... চেনা আলো আর চেনা অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে দিব্যি চলে যাচ্ছে।

অতীত: বাহ, তা চেনা মাটি, চেনা পাড়ায় আজকাল আর দেখতে পাইনা যে?

বর্তমান: চেনা চেনা হাসিমুখ গুলোকে আর তেমন ভাবে খুঁজে পাইনা রে... তবু মাঝে মধ্যে চেনা পথে কড়া নেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করি এখনো।

অতীত: মিছিলে হাঁটিস? সেই যে তোরা একসাথে একসুরে গাইতিস – পায়ে পায়ে হেঁটে যাবো, মানুষেতে মিশে যাবো, তখনই মুক্ত হবে আমার এ গান...

বর্তমান: না রে। অনেকদিন মিছিলে হাঁটা হয়নি। অনির্বাণরা অনেকেই আজ বেসুরো। তাই একসুরে গাওয়া হয়না আর। তবে শুনি, একা একা গাই কখনো সখনো।

অতীত: হতাশা?

বর্তমান: কখনোই নয়। আমি সবসময়ই আশাবাদী। কিন্তু বাস্তব কে অস্বীকার করতে চাই না।

অতীত: তাহলে স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকা?

বর্তমান: বয়স হওয়ার মানেই তো স্মৃতির সাথে আড্ডা দেওয়া! সেদিন তো তুই বর্তমান ছিলিস আর আমি ভবিষ্যৎ। তাই সেদিনের অবস্থার প্রেক্ষিতে আজকের অবস্থাকে দাঁড়িপাল্লায় ওজন করা ঠিক নয়। ইতিহাস তো একটা বহমান প্রক্রিয়া।

অতীত: কিন্তু যারা বেসুরো তারাই তো লাভবান – বিভিন্নভাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা তারাই তো মেজরিটি।

বর্তমান: লাভ ক্ষতির অঙ্ক দিয়ে তো জীবনের অর্থ মাপা যায় না। আগেও হিসেবী ছিলাম না, এখনও বেহিসেবী। আর সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ (Majoritarianism), সে যে ফর্মেই হোক না কেন, হেরে যাওয়ার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্তের সাক্ষী তো তুই নিজেই।

অতীত: কিন্তু হিসেব মেলানোর কোনো দায় নেই? সেটা তো একধরনের দায় এড়িয়ে যাওয়া। চারিদিকে যে এখন এত উন্নয়ন, সেটা তো বাস্তব।

বর্তমান: উন্নয়নের সংজ্ঞাও তো ‘মেজরিটি’ নির্ধারণ করছে। উত্তরসত্য (Post truth) যুগে উন্নয়নের রঙীন ফানুসে ভাসতে ভাসতে নাগরিক পিছু ঋণের পরিমাণের হিসেবটা ডুবেই থেকে যায়। নামের রকমফেরে বিভিন্ন শ্রী-সাথী প্রকল্প, জাতীয় সম্পদ (National asset) বিক্রী, ব্যাংক/বীমা/টেলিকম বেসরকারিকরণ (Privatization) ইত্যাদি উন্নয়নের অর্থনৈতিক মডেল। আর তার সমান্তরাল ক্ষতি (Collateral damage) হল লাগামছাড়া দুর্নীতি, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি...

অতীত: মানুষ তো এতেই খুশি।

বর্তমান: মানুষ না ‘মেজরিটি’? তবে এটা ঠিক যে মেজরিটি আর বিপ্লব চায় না, পরিবর্তন চায়।

অতীত: তা বিপ্লবপন্থীদের তো আর রাস্তাঘাটে দেখতে পাওয়া যায় না। প্রতিবাদী কন্ঠস্বরগুলোও তো আর শুনতে পাওয়া যায় না ।

বর্তমান: পায়ের তলায় মাটি না থাকলে বিপ্লব হয় না। আর প্রতিবাদ কি শুধুই শব্দময়? এটা উত্তর আধুনিক যুগ (Post modernization) অর্থাৎ বাজার নিয়ন্ত্রিত ভোগবাদ (Consumerism) আর আমরা হলাম ভোগকারী বা উপভোক্তা (Consumer) অর্থাৎ ভোটার অর্থাৎ কিনা পণ্য (Commodity)। তাই যা দেখাতে/শোনাতে বাধ্য করা হয়, যা দেখতে/শুনতে বাধ্য করা হয়, তাই দেখতে/শুনতে হয়।

অতীত: তা নিঃশব্দ প্রতিবাদ টা ঠিক কিরকম? দেখা যায় বা বোঝা যায়?

বর্তমান: চোখ কান খোলা রাখলে বা বুদ্ধি বন্ধক না রাখলে কিছুটা তো বোঝা যায় বটে। এই তো কিছুদিন আগে লোকজন ফিসফাস করছিল যে বৃষ্টির জমা জলে নাকি আমাদের প্রিয় শহরের উন্নয়নের নীল সাদা রঙগুলো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তারপর সেদিন দেখলাম যে মুদিখানা দোকানে এক খরিদ্দার সর্ষের তেল কেনবার সময় দোকানদার কে বলছেন যে সর্ষের তেলের ঝাঁজে নাকি আর চোখ জ্বালা করে না, সর্ষের তেলের দামে চোখ জ্বালা করে । আশেপাশের লোকজনকে সহমত পোষণ করতে দেখলাম। আরো শুনছি যে এক দেড় বছর আগে যারা সন্ধ্যাবেলায় উন্নয়নের কাঁসরঘণ্টা বাজিয়েছিলেন বা ঘরদোর অন্ধকার করে সেজেগুজে মোমবাতি, প্রদীপ হাতে ফটো তুলে ভূতবুক, কোস্টাগ্রাম, ভাটেরঅ্যাপ ইত্যাদিতে পোস্টিয়ে দেশপ্রেমের প্রতিযোগিতায় মেতেছিলেন, তাদেরও নাকি পেট্রোল, ডিজেল, গ্যাস কিনতে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সেসব নিয়ে নাকি তারা নিজেরা কিসব বলাবলি করছেন।

অতীত: ভূতবুক, কোস্টাগ্রাম... এসব আবার কি?

বর্তমান: ওহ, তুই তো আবার সেকেলে। ওগুলো উত্তর আধুনিক – উত্তরসত্য যুগের বাইপ্রোডাক্ট। লোকজন এসব কে ভার্চুয়াল মাধ্যম (Space) বলে।

অতীত: আচ্ছা, সেদিন একজন বলছিল কি একটা এম.আই.টি সেল হয়েছে যেখানে নাকি বিভিন্নরকম মাস্টারস্ট্রোক বিশ্লেষণ করা হয়। সেটা কি রে?

বর্তমান: ওটার বাজার এখন একটু ডাউন যাচ্ছে।

অতীত: কেন?

বর্তমান: ওই বছর খানেক আগে কি একটা আইন পাশ হয়েছিল। এম.আই.টি সেল থেকে শুরু করে ভোগবাদের ফসল (Product of consumerism)খবর পরিবেশকরা, যাদের তুই সাংবাদিক বলতিস, সবাই একসুরে সেটাকে মাস্টারস্ট্রোক বলেছিল। অনেক “পড়াশোনা না-জানা” চাষাভুষা লোকজন সেই আইনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছিল। গেলবার সাধরণতন্ত্র দিবসে তারা অনেক ট্রাক্টর নিয়ে রাজপথে ঢুকে হুলস্থুল বাঁধিয়ে দিয়েছিল নাকি।ছুটির দিনে ড্রইংরুমে বসে টিভিতে সেসব দেখে ভক্তিবাদী বাবুবিবিদের কি গোঁসা! আর সেই আগুনে ঘি ঢালছে ‘মেজরিটি’ খবর পরিবেশক। বিবিধ বিশেষণে চাষাভুষা লোকগুলো কে ভূষিত করছে। সে অনেক কিছু হওয়ার পর হঠাৎ করে সেই আইন প্রত্যাহার হয়ে গেছে। ফলে এম.আই.টি সেল থেকে শুরু করে খবর পরিবেশকদের মালিক-মালকিনদের কাছে এখনো বোধহয় নির্দেশ আসেনি এটাকে মাস্টারস্ট্রোক দিয়ে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে। তাই ওটা এখন একটু ডাউন যাচ্ছে।

অতীত: চাষাভুষা লোকগুলোর মত যদি বাকি ভোটাররাও জোট বাঁধে?

বর্তমান: বিশাল সংখ্যক এই ভোটারদের মধ্যে শ্রেণীবিন্যাস প্রবলভাবে প্রকট এবং বহুমাত্রিক যেমন ধর্মীয় বিন্যাস, জাতিগত বিন্যাস, ভাষাগত বিন্যাস ইত্যাদি। আর এসবের ওপরে আছে অর্থনৈতিক বিন্যাস। এছাড়াও একটা বড় অংশের ভোটারদের স্বার্থ, লোভ, দ্বিচারিতা, চিন্তার দৈন্যতা এসবতো আছেই। তাই চাষাভুষা ভোটারদের মতো বাকি ভোটারদের জোট বাঁধার সমীকরণ অতটা সহজ সরলরৈখিক নয়। এছাড়া অনিয়য়ন্ত্রিত অর্থ ও পেশী শক্তির দাপটের কাছে একটা উল্লেখযোগ্য অংশের ভোটার অসহায়।

অতীত: কিন্তু এই অর্থের যোগান ও পেশীশক্তি যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারাও তো ভোটার!

বর্তমান: তারা শুধু ভোটার নয়, রাজা, রানী, নেতা, মন্ত্রী, শাসকও এদের মধ্যে থেকেই হয়। আর সবার মত এরাও জানে যে এই শ্রেণীবিন্যাস একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। তাই ক্ষমতা হারানোর ভয়ে এই শ্রেণীবিন্যাস কে এরা কদর্য শ্রেণীবিভেদের   রূপ দেয়। অর্থনৈতিক বিভেদ জিইয়ে রাখবার ও প্রসারিত করবার জন্য দরকার কিছু অর্থনৈতিক নীতি (Policy) ও তার রূপায়নের জন্য চাই কিছু মডেল। আর বাকি বিভেদ গুলো প্রকটতর করবার জন্য চাই (অপ)প্রচার ও প্রোপাগান্ডা যার জন্য আছে ওই এম.আই.টি সেল, ভার্চুয়াল ও মেজরিটি মুলস্রোত মাধ্যম ইত্যাদি। এদের চাই টাকা, তারজন্য আছে কিছু ব্যবসাদার যাদের কাছে আবার আছে অঢেল পুঁজি (Capital)। এই সবকিছুকে চালনা (Sponsor) করে ওই মুষ্টিমেয় ব্যবসাদারই কারণ মুনাফা (Profit) ভোগ করে এরাই। এই মুনাফার একটা অংশ চলে যায় সেই সব ভোটারদের কাছে যারা ভাগ্যক্রমে রাজা, রানী, নেতা, মন্ত্রী ইত্যাদি হয়। এই চেনসিস্টেম টা একটা vicious cycle।

অতীত: কিন্তু ব্যবসাদাররা তাদের মুনাফার অংশ অন্যদের দেবে কেন?

বর্তমান: কারণ একটা গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ঐসব পলিসিগুলোকে বিল রূপে পাশ করানোর জন্য একটা আইনসভার প্রয়োজন পড়ে আর এই আইনসভা অলংকৃত করে থাকেন রাজা, রানী, নেতা, মন্ত্রীরা। গণতন্ত্রের ফাঁকফোকড় গ’লে আইনগুলোও পাশ হয়ে যায়।

অতীত: সেকি!তার মানে গণতন্ত্র জিনিস টা খারাপ বলছিস?

বর্তমান: খারাপ তো বলিনি! তোর কাছেই তো একদিন শুনেছিলাম গণতন্ত্রের থেকে একনায়কতন্ত্র অনেক ভালো যদি নায়ক সেখানে ভালো হয়। যাই হোক, গণতন্ত্র (Democracy) যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ (Majoritarianism) হয়ে যায় তাহলে সেটা ভয়ঙ্কর কারণ দ্বিতীয়টি স্বৈরতন্ত্রের (Fascism) পালিশ দেওয়া চেহারা। যেটা দরকার সেটা হল সামাজিক গণতন্ত্র (Social democracy)।

অতীত: কিন্তু এই সামাজিক গণতন্ত্র কি বাস্তবিকভাবে সম্ভব?তুই তো বললি যে বিভিন্ন ধরনের শ্রেণীবিন্যাস বা শ্রেণীবিভেদ একটি প্রতিষ্ঠিত সামাজিক সত্য।

বর্তমান: ঠিক কিন্তু এই যে কোন ধরনের বিভেদের মূল ও প্রাথমিক কারণ হল শিক্ষার অধিকার থেকে সব মানুষ বা ভোটারদের বঞ্চিত করে রাখা কারণ শিক্ষা আনে চেতনা আর চেতনা আনে ... শিক্ষার সমানাধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য চাই কিছু নীতি (Policy) আর আগেই বললাম যে নীতি রূপায়নের জন্য চাই আইনসভা ।অতএব, ‘মেজরিটি’ যদি আইনসভায় না থাকে তাহলে ওই vicious cycle টা আবর্তন করতে পারবে না মানে অঙ্কের হিসেব উল্টে যাবে।

অতীত: কিন্তু আমাদের সময় থেকে তো তোদের সময়ে শিক্ষার হার বেশি ?

বর্তমান: এইখানেই প্রোপাগান্ডার গুরুত্ব। সেই যে গোয়েবেলস সাহেব কি একটা বলেছিল না! স্বাক্ষরতা ও শিক্ষাকে   সমার্থক করে দিয়ে এমন প্রচার ও প্রোপাগান্ডা করা হয়েছে যে আমাদের ভোটারদের সব ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে। সে যাই হোক, তোর সময়ের মত সস্তায় শিক্ষা এখন আর পাওয়া যায়না, অনেক টাকা লাগে।

অতীত: তাহলে যাদের টাকা পয়সা নেই তারা পড়াশোনা করবে কি করে? আবার বলছিস যে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বেড়ে যাচ্ছে!

বর্তমান: সবার শিক্ষার অধিকার আর রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার (Priority) নয়। একই ছবি স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও। তাই শিক্ষা স্বাস্থ্যে বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ খুবই কম।

অতীত: তাহলে তারা চাকরিবাকরি, ব্যবসাপত্তর, কাজকর্ম – এসব কি করে করবে? তার জন্য তো শিক্ষা দরকার।

বর্তমান: তোর সময়ের ‘আমাদের ভিত্তি আর ভবিষ্যৎ’ নিয়ে যে একটা শ্লোগান ছিল, সেদিন মেজরিটি ভোটারদের একজন আমায় বললো সেটা নাকি এখন  “ভাতা আমাদের ভিত্তি, ভিক্ষা আমাদের ভবিষ্যৎ” হয়ে গেছে। মানে কোথাও একটা আশাভঙ্গ শুরু হয়েছে। আর এই মেজরিটি ভোটাররাও যেদিন বুঝতে শুরু করবে যে তারা বা তাদের নিজের বাড়ির ছেলেমেয়েরাও হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ অনথিভুক্ত বেকারদের মধ্যে একজন অথবা চুক্তিভিত্তিক কর্মী, সেদিন তারা নিশ্চয়ই অন্যরকম ভাববে।

অতীত: এটা কি তোর বিশ্বাস?

বর্তমান: নিশ্চয়ই। আর মানুষ কে অবিশ্বাস করার থেকে বিশ্বাস করে ঠকা ভালো।

অতীত: সেই নির্মাণ-বিনির্মাণ (Construction-deconstruction) তত্ত্ব?

বর্তমান: সবকিছুই সময় অর্থাৎ ভবিষ্যৎ বলবে। আর ভবিষ্যতের কাছে তুই আর আমি তো আলাদা নই, দুজনেই অতীত! এখন তোর কাছ থেকেই একসময় শোনা কিশোর কবির কয়েকটা লাইন মনে পড়ছে -

“মনে রেখো দেরী হয়ে গেছে, অনেক অনেক দেরী
আর মনে করো আকাশে আছে এক ধ্রুব নক্ষত্র
নদীর ধারায় আছে গতির নির্দেশ
অরণ্যের মর্মরধ্বনিতে আছে আন্দোলনের ভাষা
আর আছে পৃথিবীর চিরকালের আবর্তন”।

ঋণস্বীকার: কবীর সুমন এবং নচিকেতার দুএকটি গানের লাইন এই কথোপকথনে ব্যবহার করা হয়েছে।

সুমন সিনহা
০৫/১২/২০২১


Sunday, September 5, 2021

মায়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী: স্মৃতিকথন

আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে এই দিনেই মা আমাদের ছেড়ে চলে যান। মা'কে নিয়ে কোনো লেখাই আমার পক্ষে যথেষ্ঠ নয়। তবুও এই এক বছর ধরে নানা এলোমেলো স্মৃতি, কথা ও ঘটনা প্রতিনিয়ত মনের মনের মধ্যে উঁকি ঝুঁকি মেরে গেছে। সেই সব অবিন্যস্ত স্মৃতি বা ঘটনাগুলোকেই আজ ধরবার চেষ্টা করেছি।

নিম্নবিত্ত পরিবারের মহিলাদের জীবনের ছবি বোধহয় একটিমাত্র শব্দেই আবদ্ধ থাকে - সেটা লড়াই। মায়ের জীবন কে ব্যাখ্যা করতে গেলেও ওই একটা শব্দই বারে বারে ঘুরে ফিরে আসে মনে - লড়াই বা সংগ্রাম।
হুগলি জেলার শেওড়াফুলি শহরে ১৯৪৬ সালের ৩১শে জুলাই মায়ের জন্ম হয়। সাড়ে তিন বছর বয়সে দাদু (মায়ের বাবা) সপরিবার চলে আসেন কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলের পদ্মপুকুর লেনে। সেখানে ভাড়া বাড়িতে বসবাস শুরু। এর প্রায় মাস ছয়েক পরে অর্থাৎ মায়ের বয়স যখন চার বছরের কাছাকাছি, দাদু হঠাৎই মারা যান। পাঁচ বোন ও তিন ভাই কে নিয়ে দিদিমা'র (মায়ের মা কে আমি দিদিমা বলেই ডাকতাম) তখন মাথায় হাত। একমাত্র আমার বড়মাসিমনীরই তখন বিয়ে হয়েছিলো। দাদু মারা যাওয়ার পর আরো প্রায় এক বছর ভবানীপুরেই মায়েরা থেকেছে। তারপর যাদবপুরে মায়ের এক কাকার বাড়িতে ছেলে মেয়ে নিয়ে এসে ওঠেন আমার দিদিমা। সেখানে বেশ কিছুদিন থাকার পর যাদবপুরেই কিছুদিন ভাড়া বাড়িতে থেকেছেন এবং আমার বড়মামা চাকরি পাওয়ার পর যাদবপুরে নিজেদের বাড়ি করে উঠে আসেন।
খুব অল্প বয়সেই মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে গেলে নিজেকেই নিজের সাথে যুঝতে হয়। মায়ের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। আড়ম্বরহীন, অস্বচ্ছল অবস্থায় পিঠোপিঠি ভাই বোনেদের একসাথে বড় হয়ে ওঠার লড়াই। সাথে ছেলে মেয়েদের ন্যূনতম শিক্ষিত করে তোলার জন্যে দিদিমা'র অদম্য প্রয়াস ও খাটুনি। আর ছিল আমার বড়মাসিমনীর নীরব অবদান ও বড়মামার আত্মত্যাগ (sacrifice)। ভাই বোনদের মধ্যে মায়ের পর আর একটাই ভাই। ছোট হওয়ার সুবাদে মায়ের কপালে স্নেহ ও আদরের পরিমাণ অন্য ভাই বোনদের চেয়ে একটু বেশীই জুটেছিল। মায়ের পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। স্কুলে ভালো রেজাল্ট করত বলেও শুনেছি। বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও মা পড়াশোনাটা চালিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিল। প্রি-ইউনিভার্সিটি পড়ার সময় থেকেই মায়ের টিউশন করা শুরু। সাংসারিক কাজকর্ম ও টিউশন পড়িয়েও প্রধানত আমার বড়মাসিমনী ও বড়মেশোমশায়ের উৎসাহে ও বড়মামার সহযোগিতায় ১৯৬৭ সালে মা কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হ'ন। তারপর ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে (২৪শে মাঘ) মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরের এক একান্নবর্তী পরিবারের গৃহবধূ হিসেবে মায়ের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু।
বিয়ের পর অন্য এক লড়াই শুরু। এক কালের নায়েব পরিবারের অবস্থাপন্ন, স্বচ্ছল অবস্থা তখন পড়তির দিকে কিন্তু বিলাসিতার ঠাঁটবাট তখনও পুরোটা যায় নি। ভাসুর, দেওর, জা ও তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে তখন পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা ১১ জন। পরে আরো বাড়ে। এছাড়া আগেকার দিনের নিয়মমতো আত্মীয় স্বজনদের নিয়মিত আসা, যাওয়া ও থাকা। ১৯৬৬ সালে আমার ঠাকুর্দা (বাবার বাবা) মারা যান। সম্ভবত ১৯৬৮ সালের প্রথম দিকেই আমার বাবা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পদস্থ চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে চাকরি টি ছেড়ে দেয়। কলকাতা থেকে বর্ধমানের একটি গ্রামে বাবা কে বদলি করে দেওয়াতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে বাবা'র মতবিরোধ ও কাউকে না জানিয়ে চাকরি ছাড়ার নিজস্ব সিদ্ধান্ত! অতঃপর কলকাতার পাট চুকিয়ে বাবা'র দেশের বাড়িতে অর্থাৎ বহরমপুরে প্রত্যাবর্তন। বিয়ের পরে একান্নবর্তী পরিবারে বাবা'র তখন রোজগারপাতি কম ও মফস্বল শহরের এক অখ্যাত পাড়ার একটি অতি সাধারণ পরিবারে "কলকাতার মেয়ের" গৃহবধূ হয়ে এসে পাঁচটার সংসারে মানিয়ে নেওয়ার লড়াইয়ের সেই শুরু। নতুন মুখ, নতুন পরিবেশ, নতুন আদবকায়দা, নতুন রকম কথাবার্তায় মানিয়ে নেওয়ার অচেনা আপোষ সময়ের সাথে ধীরে ধীরে একদিন চেনা হয়ে যেতে শুরু করে। মনের কথা বলার লোক বলতে তখন দুজন - বাবা আর আমার কাকা অর্থাৎ মায়ের দেওর। পাড়ার ছেলে মেয়েদের টিউশন পড়ানো শুরু করেছে মা তখন।
একান্নবর্তী পরিবারগুলোর বাঁধন তখন আলগা হতে শুরু করেছে। ১৯৭২ সালের কোনো একদিন বাবা - মা'র অনুপস্থিতিতেই ১২৬ নম্বর ডেভিস রোডের বাড়ির একান্নবর্তী পরিবারের হাঁড়ি আলাদা হয়ে গেল! কলকাতা থেকে ফিরে বাবা - মা জানতে পারল একটি সংসার ভেঙে তখন তিনটে আলাদা আলাদা সংসার (একই বাড়িতে) হয়ে গেছে। দিদি বা আমি তখনও পৃথিবীর আলো দেখিনি। হাঁড়ি আলাদা হলেও মনের বাঁধন আলাদা হয় নি।
দিদি বা আমি হওয়ার সময়ও মায়ের অন্যরকম লড়াই। ডাক্তারের পরামর্শে অনেক ধরনের ওষুধ ও সাবধানতা অবলম্বনের পর দিদি ও আমি দুজনেই বিলম্বিত সন্তান। আমি ছিলাম শুধু সেই বাড়িরই না, বংশেরও কনিষ্ঠতম সন্তান (এখন অবশ্য আমার পুত্র)। জেঠঠুতো, খুড়তুতো মিলিয়ে তখন বাড়িতে মোট নয় ভাইবোন। সবথেকে ছোট ও সবচেয়ে বড়'র ব্যবধান প্রায় পঁচিশ বছর। বাবা কোনদিনই বৈষয়িক বা খুব সাংসারিক ছিলেন না। আমাদের স্কুলে ভর্তি করানো থেকে পড়ানো, পার্কে নিয়ে যাওয়া, কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি সবই মায়ের হাত ধরে। একই বাড়িতে একসাথে বড় হওয়ার যেমন সুবিধে আছে, তেমন অসুবিধেও থাকে অনেক রকম। তার মধ্যেও দিদিকে আর আমাকে কড়া শাসনে, অন্যদের অগ্রাহ্য করে ঘরের মধ্যে বসিয়ে নিয়মিত পড়ানো, স্কুলের খাতা পরীক্ষা (check) করা, পড়া ধরা ও লেখানো, শিক্ষক শিক্ষিকাদের কাছে গিয়ে আমাদের পড়াশোনার খবর নেওয়া, পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও রেফারেন্স বই জোগাড় করা বা প্রয়োজনে কেনা, আঁকা বা আবৃত্তি শেখাতে নিয়ে যাওয়া - এসব করার জন্য সাহস ও মনের জোর লাগে। এছাড়াও দুবেলা রান্না করা (ফ্রিজ থাকার কোনো প্রশ্নই ছিল না), অন্যান্য সাংসারিক কাজ, বংশানুক্রমে চলে আসা নানারকম উপাচার এসবতো ছিলই। মা - বাবা নিজেদের শখ আহ্লাদের সাথে সারাজীবন আপোষ করলেও আমাদের পড়াশোনার ব্যাপারে কখনোই এবং কারোর সাথে আপোষ করেনি। যে পরিবেশ ও যে অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমরা বড় হয়েছি সেই প্রেক্ষিতে বিচার করলে মায়ের এই লড়াই ভীষণই কঠিন ছিল। বাবা - মা'র ৩৭ বছরের বিবাহিত জীবনে বাবা মা বা আমরা কোথাও কোনোদিন বেড়াতে যাইনি, যাকে ছুটি বা অবকাশ যাপন বলে। যাওয়ার মধ্যে মূলতঃ ছিল কালনা (বড় পিসীর বাড়ি), যাদবপুর (মামার বাড়ি), কৃষ্ণনগর (দুই মাসিমনীর বাড়ি), সোদপুর (ছোট পিসীর বাড়ি) ও কলকাতা সংলগ্ন আরো কিছু আত্মীয় স্বজনের বাড়ি। তবে বেড়ানোর থেকে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের তাগিদেই সেসব জায়গায় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ও কারোর বিয়ে থাকলে যাওয়া হতো। অনেক সময় বাবা যেতেও পারতো না - মা, দিদিকে আর আমাকে নিয়ে যেতো। বাবা হয়তো গিয়ে নিয়ে আসতো। এ ভাবেই "মা - ন্যাওটা" এক মফস্বলের ছেলের শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবনে পা দেওয়া।
আমার উচ্চমাধ্যমিকের সময় দিদি এম. এস. সি পড়তে কলকাতায় চলে গেলো। আমি উচ্চমাধ্যমিকের পাশ করার পর বাবা প্রথম একটা সতেরো ইঞ্চির সাদাকালো টিভি কিনেছিলো। সময় বহমান। ২০০০ সালে আমি এম. এস. সি পড়তে কলকাতা চলে যাই আর দিদি তখন স্কুল সার্ভিস পরীক্ষা পাশ করে অন্য একটি শহরে শিক্ষিকা। তখনই মায়ের প্রথম ডায়াবেটিস ধরা পড়ে আর বাবার তো উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিলই। ২০০৩ সালে বিয়ের পর দিদি বিদেশ চলে যায়। আমিও বাড়ির বাইরে কলকাতায়। জেঠঠুতো, খুড়তুতো দিদিদের সবারই বিয়ে হয়ে তখন এক একজন এক এক জায়গায়। আর কাকার ছেলেও তখন চাকরি সূত্রে কলকাতায়। জেঠু মারা যান আমি যখন ক্লাস সেভেন। একদা একান্নবর্তী পরিবারের "সাড়ে আট কাঠা জমির ওপর দালান দেওয়া বাড়ি" তে তখন মাত্র পাঁচজন বয়স্ক মানুষ - বমা (জেঠিমা কে আমি বমা বলে ডাকতাম), বাবা, মা, কাকা, কাকী। সবারই নিজস্ব শারীরিক সমস্যা। কে আর কাকে দেখবে! ২০০৪ সালে কলকাতায় ডাক্তার দেখাতে এসে দু দিনের মধ্যে মা কে পেসমেকার বসানোর নির্দেশ ডাক্তারের। মায়ের শরীর তারপর থেকেই ভাঙতে থাকে। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাবা হঠাৎ মারা গেলেন। আমার তখন পি এইচ ডি 'র প্রথম দিক। বাবা মারা যাওয়ার দিনটাও ছিল ২৪শে মাঘ অর্থাৎ যেদিন বাবা মায়ের বিয়ে হয়েছিলো।

বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই সাহসী, ডাকাবুকো মা একদম পাল্টে যেতে থাকলো। জীবনে কারোর কারোর উপস্থিতিটাই অনেকসময় শুধু অর্থবহ হয়। ২০০৮ সালে সেপটিসিমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কলকাতার এক নার্সিংহোমে ২২ দিন ভর্তি থাকার পর মা যখন ছাড়া পেলো, তখন খুবই দুর্বল ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। বহরমপুর বাড়িতে থাকা মায়ের পক্ষে বাস্তবিকই আর সম্ভব ছিল না। কলকাতায় এক বন্ধুর মেসে প্রায় এক মাস মাকে নিয়ে থাকলাম। আমার তখন পি এইচ ডি চলছে। সেমিনার, কনফারেন্স, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি তে অন্য শহরে বা দেশে যেতে হতো। আর মায়ের পক্ষে কোথাওই একা থাকা সম্ভব ছিল না। দিদির কাছে পাকাপাকি ভাবে থাকতে মা রাজি ছিল না। শুধুমাত্র আমার কথা ভেবে সমস্ত সামাজিক বাঁধা ও সংস্কার (taboo) কে নস্যাৎ করে মা কলকাতায় বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে সম্মত হলো। ২০০৮ সালে কলকাতায় প্রথম হেল্পএজ ইন্ডিয়ার (HelpAge India) একটি আশ্রমে মা থাকা শুরু করলেন। মা ছিলেন সেখানকার প্রথম আবাসিক। রীতিমত সাক্ষাৎকার (interview) দিয়ে থাকার সুযোগ পেয়েছিলো। স্নাতক ডিগ্রি টা প্রথম কাজে লেগেছিল!
মায়ের জীবনের সবচেয়ে আরামের দিনগুলো ছিল সেই বৃদ্ধাশ্রমের দিনগুলো। জীবনের অপূর্ন ইচ্ছেগুলো পূরণ করার সব রকমের সুযোগ পেয়েছিলো মা ওই বৃদ্ধাশ্রম থেকেই। যেমন গান করা, ছবি আঁকা, হাতের কাজ, অল্পসল্প লেখালেখি, বেড়ানো ও আরো অনেককিছু। সম্ভবত সে কারণেই মা ওই জায়গাটি ছেড়ে দিতে কোনোভাবেই আর রাজী ছিল না। ইতিমধ্যে দিদি হায়দরাবাদে সেটেলড্ আর ২০১০ সালের শেষের দিকে আমার বিয়ে হল। বিয়ে অবশ্য বহরমপুর বাড়ি থেকেই হয়েছিলো। মা মাঝে মাঝে আমাদের সাথে কলকাতায় থাকতো, কখনো দিদির কাছে আবার কখনো বা বহরমপুরে কিছুদিনের জন্য যেতো। ইতিমধ্যে ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা, প্রেশার ছাড়াও মায়ের হজমের সমস্যা, ভার্টিগো ও ইউটিআই - এর সমস্যা শুরু হয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি পেয়ে আমি পুণায় চলে আসি। তখন আমার পুত্রের বয়স তিন মাস। স্ত্রী পুত্র তখন কলকাতাতেই থাকতো। আমি বা দিদি কেউই কলকাতায় না থাকলে মায়ের বৃদ্ধাশ্রমে থাকাটা ঠিক হবে না বলেই আমাদের মনে হয়েছিলো। কারণ সব থেকে বড় সমস্যা চিকিৎসাজনিত। তাই সেই বৃদ্ধাশ্রমটা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই আমরা। আমার পুণের চাকরিতে যোগদানের প্রথম আটমাস মা দিদির কাছে হায়দরাবাদে ছিল। আর তারপর থেকে পুণেতে আমাদের সাথেই। ততদিনে আমার স্ত্রীপুত্রও পুণে চলে আসে।
পুণে তে ছেলে - বৌমা - নাতির সাথে থাকার একটা সুখানুভূতি হয়তো ছিলো। কিন্তু যেটা ছিল না সেটা হল কথা বলার লোক। আর সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিবেশ যেখানে বাংলায় কথা বলার কেউ নেই। নেই সমবয়স্ক ও সমমনস্ক কেউ। আমি অফিসে চলে যেতাম, আমার স্ত্রীও কলেজে চলে যেতো। নাতি কে নিয়ে আর টিভি দেখে সারাদিন কাটে। শারীরিক অসুস্থতার সাথে লড়াই করতে করতে মা তখন ক্লান্ত। দু দুবার দুটো পা ভেঙে দুবার ভারী সার্জারি। প্রায়ই ইউটিআই। দিনের পর দিন ওষুধের সংখ্যা বেড়ে চলেছে - সাথে রোজ ইনসুলিন তো আছেই। একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি। মনমেজাজটাই ভেঙে গিয়েছিলো। নাতির সাথে দৌড়ঝাঁপ করার শারীরিক সক্ষমতাও আর নেই। সেই ছোটো বয়স থেকেই তো সংসারের চাপ! তারপর বৃদ্ধাশ্রম ছেড়ে দেওয়ার একটা আফসোস তো ছিলই।
শেষবার পা ভাঙল গতবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। পেসমেকার পাল্টানোর কথা ছিল, তার আগেই স্নান করার সময় পড়ে গিয়ে পা ভাঙল। হাসপাতালে পায়ের সার্জারি হওয়ার পর যখন ছাড়া পেলো, তখন করোনা অতিমারী শুরু হয়ে গেছে। যখন শরীরটা একটু ভালোর দিকে, তখন ইউটিআই শুরু হলো আবার। ধীরে ধীরে ভুলে যেতে শুরু করলো। শেষ সার্জারির ধকল আর নিতে পারলো না। গত বছর পাঁচই সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ সেরিব্রাল অ্যাটাক হল। করোনা অতিমারীর ভয়ঙ্কর অবস্থায় পুণের কোনো হাসপাতাল, নার্সিংহোমেই তখন কোনো শয্যা খালি নেই। পরিচিত ডাক্তারবাবুরাও অসহায় অবস্থায় তাঁদের অক্ষমতা জানিয়ে দিলেন। আমার সরকারি চাকরির কোনো সুবিধেই কোনো কাজে এলো না। এমন কি একটা অ্যাম্বুলেন্সও পাওয়া গেলো না। মা তখন প্রায় - অচেতন। শেষ অবধি আমার নিজের গাড়িতেই কয়েকজন সহকর্মীর সাহায্যে ও একজন সহকর্মীর ব্যক্তিগত প্রভাবে একটা মাঝারি মানের হাসপাতালে মা'কে নিয়ে যেতে পারলাম। সেখানে ডাক্তার দেখার পর বাড়ি নিয়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। সে সময় মায়ের যে সাপোর্ট সিস্টেম দরকার ছিল, সেটি ওই হাসপাতালে নেই এবং আরো জানালেন, যে সব হাসপাতালে সেই সাপোর্ট সিস্টেম আছে সেগুলোর কোথাওই একটুও জায়গা নেই। শেষ চেষ্টা হিসেবে আরো ছোটো একটি নার্সিংহোমে গেলাম। সেখানেও ডাক্তার একই কথা বললেন। সাথে জুড়লেন, বড় নার্সিংহোমে জায়গা পেলেও মা করোনা আক্রান্ত হবে এবং তাতে আমাদের সমস্যা আরো বাড়বে!
মা কে নিয়ে যখন ফিরে এলাম তখন ঘড়ি তে প্রায় দুপুর দেড়টা। বাহুল্য বর্জিত তিন কামড়ার এক সরকারি আবাসনের একটি ঘরে বসে আমি তখন কিংকর্তব্যবিমুঢ়, আমার পুত্র অন্য একটি ঘরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপ করে বসে আছে, মায়ের পরিচারিকা তখন ডাইনিং রুমে দুপুরের খাবার খাচ্ছে আর আমার সহধর্মিণী, আমার এক সহকর্মী এবং আমার বিভাগীয় প্রধান ও ওঁনার স্ত্রী মায়ের ঘরে বসে মায়ের শেষ লড়াইয়ের সাক্ষী। দিদি তখন হায়দরাবাদে অনলাইন ক্লাস নিচ্ছে। হুঁশ ফিরল আড়াই টা নাগাদ যখন আমার সহকর্মী আমায় বললো "সুমন, তুমহারা মাতাজী শায়দ ঔর নেহি হ্যায়"। সাড়ে তিনটে নাগাদ আমার আর এক সহকর্মীর ডাক্তার-পত্নী এসে আনুষ্ঠানিক মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করলেন ও বিকেল পাঁচটা নাগাদ আমার অফিসের সরকারি ডাক্তারবাবু এসে ঔপচারিক মৃত্যু-শংসাপত্র আমাকে দিয়ে গেলেন।

শিক্ষক দিবসের দিনেই হারালাম আমার জীবনের প্রথম ও প্রধান শিক্ষক আমার মা কে। মায়ের আঁচলের হলুদের গন্ধে বড় হওয়া এক অতি সাধারণ মফস্বলের ছেলে কে আজকের মেট্রোপলিটান তৈরী করতে মায়ের সময় লেগেছিল ৪৩ বছর। আর এই ৪৩ বছরের নাড়ির যোগ ছিন্ন হয়েছিল মাত্র একটা মুহুর্তে - যে মুহুর্তের একটা দিকে 'মা আছে', অন্য দিকে 'মা ছিল'।

নীচে পাঁচটি ছবি দিলাম। ১: মায়ের কলেজ জীবনের তৃতীয় বর্ষের ছবি। ২: মায়ের গানের ডায়েরির একটি পাতা। নিজের হাতের লেখায় গীতবিতানের একটি গান। ৩: কলকাতায় বৃদ্ধাশ্রমে থাকাকালীন বিভিন্ন মুহূর্তের কোলাজ। ৪: আমার পুত্রের জন্য একটি খাতায় মা নিজের হাতে অনেকগুলি ছড়া লিখেছিল, যেগুলি আমরাও ছোটবেলায় পড়েছি। সব ছড়াগুলোই মা স্মৃতি থেকে লিখেছিল। সেই খাতারই একটা পাতার ছবি। ৫: শেষবার ২০১৯ সালের অক্টোবরে দমদমে বড় মাসিমনীর বাড়ি তে ভাইফোঁটার দিন। ছবি তে মা, আমার দুই মামা (বড় ও ছোট) ও দুই মাসিমনী (বড় ও সেজো)।

সুমন সিনহা
০৫/০৯/২০২১







Tuesday, August 24, 2021

Bina Das – ‘Unknown, Unwept and Unsung’

This year we are celebrating the 75th anniversary of our independence from the British colonist. Unfortunately, the independent India drank so much into oblivion that the sacrifices of countless young men and women in Indian freedom movement slowly faded away into obscurity. This is especially true when it comes to women radicals. Despite equal involvements in Indian freedom struggle, the representation of women finds very little room in the documentation of Indian freedom fighters. To our utter surprise, history textbooks have been quite silent too about them. The present essay is on one such unsung heroine Bina Das whose life and legacy deserve to be celebrated with due honour and dignity.

Bina Das was born on August 24, 1911 in Krishnanagar, West Bengal. Her father was Beni Madhab Das, the educationalist and the well-known teacher at Cuttack’s Ravenshaw Collegiate School and her mother was Sarala Devi, the noted social worker. Beni Madhab Das inspired many of his students for the cause of Indian freedom, the most notable being Subhas Chandra Bose, popularly known as Netaji. Sarala Devi used to run a women’s hostel in Calcutta, which was used as a shelter for the revolutionaries belonging to different underground groups. So the seeds of revolution were sowed in Bina early. Her parents were deeply involved with the Brahmo Samaj and they focused on the upliftment of women and women’s right in Bengal. They believed in giving their daughters education, freedom and a quest for learning.

“Subhas Babu” was tremendously influenced and inspired by Bina’s father and was a regular visitor to her parents’ home. Bina Das was a great admirer of Netaji and his political beliefs appealed to young Bina, serving further push in her stance against British Rule. In her school days, she first rebelled and refused to welcome the British Viceroy’s wife, for her visit to their school, the way the school authority had planned. In the English paper of her matriculation examination, the students were asked to write about their favourite novel. Bina Das, who used to stand first in the class, wrote on Sarat Chandra Chattopadhyay’s ‘Pather Dabi’ (The Call of the Road, 1926). The novel, which was about a secret society that wanted to free India from the British rule, was banned at that time. This act of defiance did cost Bina her marks in the matriculation examination. In her memoir, Smt. Das recalled that the marks, she had lost in the examination, was her first offering to her country.

After matriculation, she was admitted to Diocesan College of Calcutta and later she joined Bethune College under the University of Calcutta. During her Diocesan days, she joined ‘Chhatri Sangha’, a semi-revolutionary women’s organization. Netaji continued to play the role of a mentor in her life and she cultivated her sense of political righteousness independently. The college library books that urged theories of revolution and freedom encouraged Bina further to see an independent India. Smt. Das, along with her group of fellow students, organized their first student protests against Simon Commission in 1928 and faced threats from the college administration. The then English Principal threatened her with dire consequences if she did not apologize. Smt. Das cared a fig and the “overbeating Englishwoman” resigned from service and left the Institution. This was her first taste of victory against British oppression. In her college days, the conversations and meetings of her, the mentee, with Netaji, the mentor left a lasting impression on her young and impressionable mind. In her memoir, she mentioned that once she asked Netaji – “How do you think our country will get freedom? Through violence or non-violence?” The mentor replied – “You must want something madly before you can achieve it. Our nation must want freedom passionately. Then the question of violence or non-violence will not be important.”

Then came the Spring of 1932. Smt. Das came to know that the Bengal Governor Stanely Jackson would attend the convocation ceremony at the University of Calcutta. She approached her friend Kamala Dasgupta of ‘Jugantor’, another revolutionary group for weapons. Smt. Dasgupta first refused her to give weapons and tried to convince her of the serious consequences of opening fire on the Governor but finally agreed to supply weapons Bina needed to execute her plans. In February 06, 1932, while Jackson was delivering a speech to a packed hall of fresh graduates in the convocation hall of the University of Calcutta, Bina Das came close to the dias using an excuse of being thirsty for a glass of water and sat in an empty chair with a loaded Belgian revolver concealed in her convocation gown. Moments into the speech, the timid-looking girl opened fire and had five shots at Jackson at close range. After firing two shots, she was overpowered by the then Vice-chancellor of the University of Calcutta Lieutenant Colonel Hassan Suhrawardy and in a state of being overpowered, she fired three shots. Jackson’s ear was grazed by one of the bullets and another bullet injured senior Professor Dr. Dinesh Chandra Sen. Bina Das made the headlines next day and was arrested. After a one-day trial, she was sentenced to nine years of rigorous imprisonment and the British, having been so impressed by Suhrawardy’s ‘noble deed’, awarded him a Knighthood for the trouble. Bina’s graduation degree was also withheld. The gravitas of Smt. Das’s revolutionary impact lies in her statement she gave at Calcutta High Court after the attempted assassination. She said – “I fired at the Governor, impelled by the love for my country which is repressed…I invite the attention of all to the situation created by the measures of the Government. This can upset even a frail woman like myself, brought up in all the best traditions of Indian womanhood. I can assure all that I have no personal ill will against the Governor. As a man, he is just as good as my father. But as a Governor of Bengal, he represents a system which has kept enslaved 300 million of men and women of my country.” Before her trial, her distraught parents were brought to Lalbazar, the police headquarters, to meet Bina. The police requested them that if their daughter revealed where she got the gun, she would be treated with leniency. Bina snarled to her captors that “my father did not raise traitors”. She was sent to Midnapore prison to serve out her terms and she started a hunger strike there to protest the poor conditions. The authorities accepted her demands within a week. In 1939, she was released from the prison, two years before her terms on interference of Mahatma Gandhi. After release, she met her mentor Netaji for the last time, only to never see him again. She joined Congress Party upon release and in 1941, she was appointed head of the Party’s South Calcutta Chapter. She actively participated in the Quit India movement and in support of that, she called for a public meeting at Hazra Crossing in South Calcutta, flouting the police orders. This led her to imprisonment again, this time for three years in Presidency Jail. She was a member of the Bengal Provincial Legislative Assembly from 1946 to 1947 and of the West Bengal Legislative Assembly from 1947 to 1951. In 1947, she married a fellow revolutionary Jatish Chandra Bhaumik, a member of the ‘Jugantor’ group. In early 1950s, the workers’ union of the leading Calcutta daily ‘Amrita Bazar Patrika’ started an agitation demanding better working conditions and pay. Bina Das was then the head of the trade union. While the much-publicized policy of the ruling Congress Party was the amelioration of the abject conditions of the working class, the Party sided with the Management, to Das’s utter surprise. Needless to say, Smt. Das sided with the workers. Indian independence came at the cost of the partition leaving a permanent scur. Countless freedom fighters like Bina Das were not naturally happy to see their motherland divided. When the partition refugees from East Bengal were barred from settling in the West Bengal and sent to far off Dandakaranya in Madhya Pradesh, she protested strongly and refused her freedom fighter pension from the Government of India, along with her husband, for the rest of their life. She discovered a world different from the one, that she had been to a decade ago. With the country switching over to electoral politics, Bina Das kept herself aloof from the politics of power, profit and pelf in the name of public welfare. In 1960, the Government of India awarded her the Padma Shri for her contributions in social work. Not much is known about her life after that. She took up teaching as a profession. It has been learnt that professionally she suffered since she did not have a graduation certificate. However, nearly 80 years later, in 2012, the University of Calcutta posthumously awarded Bina Das her pending Bachelor of Arts degree with Honours in English for the year 1931. It is to be noted here that Pritilata Waddedar was also conferred the graduation certificate by the University of Calcutta in 2012.

After the death of her husband, Smt. Das led a very lonely life and isolated herself. Finally, she left Kolkata and was living in Rishikesh (now in Uttarakhand) in penury. On December 26, 1986, a woman’s dead body in a partially decomposed state was found roadside by the passing crowd. The police were informed and they recovered the body from a roadside ditch in Rishikesh. It took the authorities a month to confirm the identity of the dead body as Bina Das. It has been learnt that Dr. Triguna Sen, the first Vice-chancellor of the Jadavpur University, Kolkata and the former Union Minister for Education in Government of India, helped the police in identifying her dead body. That a dignified personality who sacrificed her today for our tomorrow, a freedom fighter in British India and a Padma Shri winner in independent India died homeless, ‘unknown, unwept and unsung’, is cruelly ironic.

Let us hope that in the year of diamond jubilee celebration of our independence, Smt. Bina Das will be granted a dignified space in the mainstream narratives of the documentation of Indian freedom fighters and will find a significant mention across the pages of history textbooks.

Suman Sinha
24/08/2021

Sources / References: 
Wikipedia,  https://indianexpress.com/, https://www.livehistoryindia.com/, 
https://feminisminindia.com/, https://timesofindia.indiatimes.com/




জীবনানন্দ দাশ

আজ "নির্জনতম কবি"র মৃত্যুদিন। বিবরবাসী এই মানুষটির সোচ্চার স্বপ্ন ছিলো "কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে"। ভীষন ক্লা...