Thursday, April 29, 2021

Irrfan Khan

    Last year on this day, Sahabzade Irfan Ali Khan, popularly known as Irrfan Khan or simply Irrfan left us. It was his personal choice to add an extra 'r' in his name. Irrfan Khan, a name synonymous with struggle, persistence and consistency is a phenomenal talent in the filed of arts. With no godfather in Bollywood or Hollywood, he had conquered the hearts of movie-lovers and left a lasting impression in the cinema world. Irrfan was described by Peter Bradshaw of The Guardian as a "distinguished and charismatic star in Hindi and English-language movies whose hardworking career was an enormously valuable bridge between South Asian and Hollywood cinema". 
    He did never typecast him and the adjective which describes him best is perhaps versatility. Born in Rajasthan into a Muslim family of Pathans with Rajasthani ancestry, Irrfan used to paly cricket well and was selected in the prestigious CK Nayudu Trophy for emerging players under 23 category. However, he failed to attend as he could not afford travel expenses. He was influenced by his maternal uncle who was a theatre artist in Jodhpur. He did a number of stage performances at his early age in Jaipur where he was introduced with noted theatre artists. On completion of his MA in Jaipur, he joined National School of Drama (NSD) in New Delhi in 1984 to study acting.
    Just after his graduation from NSD in 1987, Irrfan made his debu with Mira Nair's 'Salaam Bombay' with a minor role. Since then, he acted in numerous television serials, teleplay, drama films as well as various other films. Few of them, which deserves special mention, are 'Laal Ghaas Par Neele Ghode' (he played Lenin in the teleplay), 'Bharat Ek Khoj', 'The Great Maratha', 'Chandrakanta' (90s supernatural fantasy period drama). Irrfan also played the famous revolutionary, Urdu poet and Marxist political activist of India, Makhdoom Mohiuddin in 'Kahkashan'. Few of his critically acclaimed films in his early career are 'Kamla Ki Maut' (opposite Roopa Ganguly, 1989), 'Ek Doctor Ki Maut' (1990) and 'Such A Long Journey' (1998). Unfortunately, all these went unnoticed! The historical film 'The warrior' (2001), where he was cast as the lead, opened at international film festivals. In 2004, his outstanding performance in 'Maqbool', an adaptation of Shakespeare's Macbeth, was very much critically acclaimed. 
    It is until 2007 when he came up with box office commercial hits 'The Namesake' and 'Life in a Metro', which won him Filmfare Best Supporting Actor Award. The very next year came his international success with 'Slumdog Millionaire', for which he won the Screen Actors Guild Award for Outstanding Performance. He will always be remembered for his remarkable performance in the title character in 'Paan Singh Tomar' (2011), which won him the National Film Award for Best Actor. He went on to gain critical acclaim for his starring roles in 'Life of Pi' (2012), 'The Lunchbox' (2013), 'Piku' (2015), 'Talvar' (2015), 'Jurassic World' (2015) and 'Inferno' (2016).  His rejection to a big offer in the 'Interstellar' for 'Lunchbox' in 2013 shows his commitment towards work. 
    Irrfan's most commercial hits (highest grossing) came with 'Hindi Medium' (2017) and his final screen appearance was in its sequel 'Angrezi Medium' (2020). These two performances won him the Filmfare Award for Best Actor in 2018 and 2021 (posthumously). He has a National Film Award, an Asian Film Award and six Filmfare Awards among numerous accolades to his credit. He was awarded the Padma Shri in 2011 and Filmfare Lifetime Achievement Award posthumously in 2021.
    Let me conclude with an incidence which shows his recognition in global level. Julia Roberts once stopped outside the Kodak theatre where Oscars were being staged, just to compliment Irrfan Khan on his brilliant performance in the movie 'Slumdog Millionaire' (2008).

Rest in arts Irrfan !!

Suman Sinha
29/04/2021



Wednesday, April 28, 2021

তিনদিন আগে খবরটা শোনার পর থেকেই মন টা ভারাক্রান্ত। বিশ্ববরেণ্য পরিচালক মৃণাল সেন মহাশয়ের ব্যবহৃত আর্কাইভযোগ্য নথি, পুরস্কার কিছুই আর পশ্চিমবঙ্গ বা আমাদের দেশে থাকলো না। ওঁনার পুত্র কুনাল সেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে এসব দান করে দিয়েছেন সংরক্ষণের জন্য। কুনাল বাবুর ফেসবুক পোস্ট থেকে জানতে পারি মৃণাল সেন মহাশয় ওঁনার আলস্য থেকে কোনোদিনই নিজের সৃষ্টিকে যত্ন করে ধরে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন না। উনি জীবিতকালেই ওঁনার 'deep distrust for nostalgia' থেকে নিজের চিঠিপত্র, চিত্রনাট্য, পান্ডুলিপি সবই ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। বাকি যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, সেটুকু মাত্র তিনটে কার্ডবোর্ডের বাক্সেই ধরে যায়! শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই কুনাল বাবু কে প্রথম অনুরোধ করেন যে তাঁরা মৃণাল সেন মহাশয়ের নথিপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ আর্কাইভে সংরক্ষণে আগ্রহী। আমরা আত্মবিস্মৃত জাতি। এই আক্ষেপ থেকেই যাবে যে 'ক্যালকাটা 71' এর নির্মাতার কোনো স্মৃতিচিহ্ন কলকাতা শহরে রইলো না আর। কুনাল বাবুর কথায় "I don't know if anybody will be interested in him or his life in another hundred years." অনাদরে, অবহেলায় পড়ে থাকার চেয়ে ওঁনার নথি যদি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাগারের বিশেষ আর্কাইভে স্থান পায়, সেটাই কাম্য। কুনাল বাবু সঠিক কাজই করেছেন। সরকারও কি উদাসীন!

এ প্রসঙ্গে বলে রাখি ওঁনার সংগ্রহের কিছু বই মুম্বইয়ের Film Heritage Foundation - এ এবং আরো কিছু বই, ছোটোখাটো আসবাবপত্র ও ব্যক্তিগত কিছু সরঞ্জাম উত্তরপাড়ার 'জীবনস্মৃতি' তে রাখা আছে। ওঁনার ব্যবহার্য কিছু জিনিস যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও রাখা থাকবে।

কারোর উৎসাহ থাকলে এই ওয়েবসাইট টি দেখতে পারেন।

সুমন সিনহা
১২/০৪/২০২১

ছবি : আন্তর্জাল


Monday, April 26, 2021

বছর কুড়ি পর

দিনটা ছিল পনেরোই মার্চ। কে.সি স্যারের বাড়ির গলি যেখানে বড় রাস্তায় এসে মিশেছে, ঠিক সেই মুখটায় দাঁড়িয়েছিল সুপ্রিয়। নতুন সিগারেট ধরা সুপ্রিয় মোড়ের দোকান টা থেকে একটা সিগারেট কিনে অনভ্যস্ত ভঙ্গিতে একটু বেশী সাবধানী হয়েই সিগারেট টা টানছিল। চেনাজানা কেউ যেন দেখে না ফেলে। সুপ্রিয়র তখন বি.এস.সি সেকেন্ড ইয়ার। সময় কাটানোর বেশ ভালো একটা উপায় সিগারেট খাওয়া, তবুও সময় যেন কাটতেই চাইছিল না সুপ্রিয়র। অনেক কিছু ভাবার চেষ্টা করছিলো সুপ্রিয়, বোঝারও। কিন্তু এলোমেলো হাওয়ার মতোই ভাবনাগুলোও বড় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি অবশ্য। তাই চিন্তা ভাবনার অবকাশও স্থায়ী হয়নি বেশিক্ষণ। সিগারেট টা শেষ হওয়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মুখ ঘুরিয়ে দেখে অমলিনা আসছে। সুপ্রিয় কে দেখে যে এতটা অবাক হবে সেটা সুপ্রিয়ও অনুমান করতে পারেনি। তবে মুখে বহু পরিচিত হাসি ফিরিয়ে আনতেও বিলম্ব করেনি অমলিনা। এটা বুঝতেও অমলিনার কোনো ভুল হয়নি যে তার জন্যই সুপ্রিয়র দাঁড়িয়ে থাকা। বুদ্ধিমান, সপ্রতিভ সুপ্রিয় সেটা লুকোবার চেষ্টাও করেনি।
অমলিনা মুখে হাসি নিয়েই জানতে চেয়েছিলো বসন্তের শুরুতেই সকালবেলায় রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ টি। জানতে চাওয়ার মধ্যে হয়তো একটু সূক্ষ্ম ব্যাঙ্গও ছিল। সুপ্রিয় যে একটু অপ্রতিভ হয়ে পড়েনি এই প্রশ্ন শুনে এমনও নয়। তবে উত্তরও দেয় নি। কিছু প্রশ্নের উত্তর হয়না। বা যে উত্তরে গোপনীয়তা রাখার দায় সুপ্রিয়র নেই, সেটা উহ্য থাকাই বরং ভালো। বেশ কিছুটা রাস্তা পাশাপাশি হাঁটার পর যখন অমলিনা বলেছিলো অরগ্যানিক কেমিস্ট্রির কয়েকটা রিয়্যাকশন মেকানিজম বুঝিয়ে দেওয়া যাবে কিনা, তখন সুপ্রিয়র হুঁশ ফিরেছিল। পাল্টা জানতে চেয়েছিলো সুপ্রিয় রিয়্যাকশন মেকানিজম বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য কেউ বসন্তের শুরুতে সকাল বেলা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিনা। অমলিনাও উত্তর টি উহ্য রেখেছিলো তবে হাসি চাপা দেওয়ার চেষ্টা টি গোপন করতে পারেনি। আরো কিছুক্ষণ চুপচাপ পাশাপাশি হাঁটার পর বলেছিলো " এবার যেতে হবে রে। আর হ্যাঁ, কেমিস্ট্রি টা কিন্তু একদিন বুঝিয়ে দিস...শোন্ কেরিয়ার টা নিয়ে একটু ভাব, ফিউচার টা সিকিউরড্ হবে। কলেজে দেখা হবে.. বাইইই...।"
শুধু কি কেমিস্ট্রিই প্রিয় ছিল সুপ্রিয়র? বেহিসেবী সুপ্রিয় বুঝতে পারেনা ভবিষ্যৎ জিনিস টাই যখন অনিশ্চিত, তাকে সুরক্ষিত করার নিশ্চয়তা কিভাবে দেওয়া যায়!
বছর কুড়ি পর। সুপ্রিয় তথাকথিত অর্থে প্রতিষ্ঠিত। সুরক্ষিত চাকরি। না, সুপ্রিয় কেমিস্ট্রি পড়েনি বা বলা ভালো প্রিয় কেমিস্ট্রি তার কেরিয়ার হয়নি। সুপ্রিয়'র জগৎটা অনেকটা সীমাবদ্ধ, কিছুটা বিচ্ছিন্নও বোধহয়। কয়েকদিনের জন্য নিজের প্রিয় শহরে সুপ্রিয়। স্মৃতির সাথে এনকাউন্টার! কে.সি স্যারের বাড়ির গলির মোড়ের দোকানটায় সিগারেট কিনতে গিয়ে দেখে সেটি বেশ বড় একটা স্টেশনারী দোকান হয়ে গেছে। এটা কি রাইসিং অফ্ দ্য প্রলেতারিয়েত... সত্যিই কি তাই? একটা সিগারেট কিনে ধরালো সুপ্রিয়। কিছুটা আনমোনা। বড় রাস্তার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো সুপ্রিয়, কোনো প্রিয় জিনিসই সুপ্রিয়'র জীবনে স্থায়ী হয়নি, প্রিয়রা কখনো ধরা দেয়নি সুপ্রিয়'র কাছে। সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ বোধহয় প্রিয়দের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়... কাঙ্খিত কেরিয়ারও কি দেয়? বাতাসে সিগারেটের ধোঁয়া গুলো মিলিয়ে যেতে লাগলো।

সুমন সিনহা
১১/০৪/২০২১

বড়দিনের ডায়েরি

গতকাল বড়দিন চলে গেলো। আজকাল যে কোনো উৎসব এলেই কেমন একটা বিষণ্নতা বোধ হয়। উৎসব উদযাপনে অংশগ্রহণ করলেও কেমন একটা অপূর্ণতা থেকে যায়, কিছু একটা না পাওয়ার ব্যাপার অনুভূত হয়। অনেকটা ওই 'কি জানি কিসের লাগি, প্রাণ করে হায় হায়'। এবারে এই প্যান্ডেমিক ক্লান্ত বড়দিনে ঘরের মধ্যে সপরিবারে ছুটি ও উৎসব উদযাপন করতে করতে সেই অনুভূতি আরো প্রকট হল। নিজেকে মাঝে মাঝে কিছুটা বিচ্ছিন্নও মনে হলো।

আমার পুত্রের বয়স ছ'বছর। স্বভাবতই ওর উৎসাহ ও উদ্দীপনা অনেক বেশি। তার কারণও ভিন্ন। বাড়িতে একটা ক্রিসমাস ট্রী আছে। সেটাকে বের করে ঝাড়পোষ করা, তাকে ডেকোরেট করা, তারপর তার মধ্যে টুনি (লেড) লাইট লাগানো - এসবে ওর উত্তেজনার শেষ নেই। উপরিপাওনা হিসেবে এবারে ওর বিগদাদা আবার বিভিন্ন রঙের লেড লাইট জ্বলা একটা বেলুনও দিয়েছে। তাই উত্তেজনার পরিমাণও একটু বেশী এবারে। বিভিন্ন ভাষায় জিঙ্গিল বেল চালিয়ে ওর লাফালাফি, দাপাদাপি করা - এসব দেখতে বেশ ভালোই লাগছিলো। প্রাণের স্পন্দন দেখতে কার না ভালো লাগে। সকালবেলা কেক কাটাও হয়েছিলো।

কেক কাটার সময়ই ছোটবেলার কেককাটার স্মৃতি মনে এলো। আসলে এখন যে কোনো উৎসবের সময়ই আমাদের ছোটবেলার উৎসব যাপনের দিনগুলো মনে পড়ে যায় এবং অবধারিত ভাবে একটা তুলনা চলে আসে। আমার ছোটবেলার বড়দিন পালনের প্রধান অংশ ছিল সকালবেলা কখন কেক কাটা হবে আর মা বিকেলে কখন চার্চে নিয়ে যাবে। তখন বছরে ওই একদিনই কেক আনা হতো বাড়িতে। দু একবার ছাড়া কখনো আমার জন্মদিন পালন করা হয়নি আর জন্মদিনে কেক কাটার রেওয়াজ ছিল না। এখন তো সারাবছরই কেক পাওয়া এবং খাওয়া যায়। সহজলভ্যতা যে কোনো জিনিসেরই গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। তাই বড়দিন কে ঘিরে বছরে একবার কেক কাটার যে একটা রোমাঞ্চ ছিল, সেই রোমাঞ্চ কোথায় হারিয়ে গেছে। আমার ছেলের মধ্যেও কেক কাটার আলাদা কোনো উত্তেজনা নেই। ওর কাছে কেক খাওয়াটা শুধু প্রাতঃরাশ ছিল।

আমাদের ছোটবেলায় সান্তাক্লজের নামটাম বিশেষ শোনা যেতো না। জিঙ্গিল বেল আমি শুনিনি। ক্রিসমাস ট্রী'র ফান্ডা জানা ছিল না। আর মোজার ভেতর সান্তাবুড়ো এসে উপহার সাজিয়ে দিয়ে যাবে - এমন রূপকথার জীবনে বড় হই নি। মেরি ক্রিসমাস উইশ করার বাতিক বা ফর্মালিটিও আমাদের বা বড়দের মধ্যে ছিল না। আমাদের মূল আকর্ষণ ছিল বড়দিনের তিন চার দিন আগে থেকে দোকানগুলোয় রঙিন কাগজে মোড়া বিভিন্ন রকমের কেক সাজানো দেখা। সেই দেখাতেই কি ভীষন খুশী আর আনন্দ। আর বাবার কাছে আব্দার ছিল কেক কিনতে যাওয়ার সময় যেনো আমাকে দোকানে নিয়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল আরও কাছের থেকে রঙিন কাগজে মোড়া কেকগুলোকে দেখা। কিনবার পছন্দ আমার বা দিদির ছিল না। বাবা বা মা দাম অনুসারে যা কিনবেন সেটাই আমাদের আনন্দের কারণ। শুধু কেনার পর মনে হতো ইশ্ আরেকটু বেশি দাম দিয়ে যদি ঐ কেক টা কিনতো! কিন্তু শুধু মনেই, বলতে পারিনি কোনোদিন মুখে। এবারে যখন ছেলে কে বললাম যে চল্ কেক কিনে আনি, ওর সরল উত্তর ছিল 'বাড়িতেই তো মাইক্রোওয়েভ ওভেন আছে, ওখানে তো মাম্মা কেক বানায় প্রায়ই - বাইরে থেকে কেক কিনতে যাবে কেনো?' ওর এই সহজ উত্তরের মধ্যে ওর অজান্তেই কোথাও একটা প্রাচুর্যতার ইঙ্গিত আমাকে নাড়া দিয়েছিলো। জানিনা এটাকে 'rising of the proletariat' বলা বা ভাবা যায় কিনা! এখন তো উৎসব মানেই প্রাচুর্যতা ও দেখনদারি।আর ছিল বিকেলে মায়ের হাত ধরে আমার আর দিদির চার্চে যাওয়া। সেটাই ছিল বড়দিনের প্রধান আকর্ষণ। মফস্বল শহরের সাদামাটা চার্চ সেদিন আলোয় সেজে উঠত। ভেতরে মেরি মাতা ও যীশুর মূর্তি ও ছবি, মাটির তৈরী মেষশাবক, আলো দিয়ে তারা সাজানো - এসব অপলক মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখতাম। মা যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার গল্প বলতেন, আমরা শুনতাম। বাড়ি ফিরতে মন চাইতো না। মা তাড়া দিলে বলতাম আর একটু, আর একটু। ভিড়ের মধ্যেও ঐ মেষশাবক গুলোকে বারবার দেখে যেতাম। মেরিমাতার কোলে যীশুকে দেখে একটা অদ্ভূত ভালোলাগা কাজ করত। চলে আসার সময় মনে হতো আবার একবছর পর এই চার্চে আসতে পারবো। কখনো আমাদের কে বলা হয়নি যে আমরা কোনও ধর্মীয় স্থানে যাচ্ছি। সেই বোধটাই কখনো আসেনি। ঠিক যেমন বড়দিনের কেক খাওয়ার সময় কখনো মনে হয়নি সেকুলার প্রমাণ করার জন্য কেক খাচ্ছি, সেমাইয়ের পায়েস বা বিরিয়ানি খাওয়ার সময়ও কখনো মনে হয়নি। উৎসবের আমেজ, উৎসবের মেজাজ, উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়াতেই উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব নিহিত থাকে। ধর্মীয় সঙ্কীর্নতা উৎসবের প্রকৃতি বা চরিত্রের ওপর থাবা বসালে বিষণ্ণতা আসে না? আজকাল যে কোনো উৎসব কে ঘিরেই একটা সমান্তরাল ধর্মীয় প্রচার ও উস্কানি লক্ষ্য করা যায়। সময়ের সাথে উৎসব পালনের ধরন বা রকম বদলাতেই পারে, তাই বলে উৎসবের আবেদন কি পাল্টে যেতে পারে?

এসব নানান কথা ভাবতে ভাবতেই দুপুর গড়িয়ে বিকেলও চলে গেলো। শীতের বিকেলের স্থায়িত্বই বা কতটুকু! সন্ধেবেলা পুত্রের দাবি বা আব্দারে ওর পুণের জেঠু, জেম্মা ও বিগদাদা এলো। পিকুর সম্মানে আরো একবার ওদের আনা কেক কাটা এবং খাওয়া হলো। একসাথে বেশ কয়েকটি ফটোও তোলা হল। ফটো তোলাও এখন কত সহজলভ্য! ছোটোবেলার বড়দিনের কোনো ফটো ফ্রেমবন্দী নেই। ওরা চলে যাওয়ার পর সেই আক্ষেপ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আবিষ্কার করলাম যে ২৫শে ডিসেম্বর নাকি 'গীতা জয়ন্তী'। এর আগে কখনো জানতাম না। আমার প্রিয় শহরের যে চার্চ নিয়ে এত স্মৃতি, সেই চার্চের সামনেই কিছুজন 'গীতা জয়ন্তী' উপলক্ষে 'গীতা বিতরণ কর্মসূচি' তে অংশগ্রহণ করে 'বড়দিন' পালন করেছেন! চার্চের সামনে ছাড়া অত বড় শহরে আর জায়গা ছিল না গীতা বিতরণ করার! এই আপাত 'ছোট্ট ঘটনা' টি সারাদিনের সুখানুভূতি গুলোকে একটা না-বোঝাতে পারা মনখারাপে ঢেকে দিলো। সেই বিষন্নতা ও গীতাপ্রাপকরা গীতা পড়বেন এই আশা নিয়ে প্রার্থনা করলাম বড়দিন শুভ বোধের হোক, বড় মনের হোক।

শুতে যাওয়ার সময় মহীনের ঘোড়াগুলি'র একটা প্রিয় গান শুনতে বড় ইচ্ছে হলো। তারই তিনটি লাইনের রেশ নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি দিলাম...

"তবুও কিছুই যেনো ভালো যে লাগে না কেনো 
উদাসী পথের মাঝে মন পড়ে থাকে যেনো 
কোথায় রয়েছে ভাবি লুকিয়ে বিষাদ তবুও।" 

সুমন সিনহা
২৬/১২/২০২০

পর্ব - ৩

যা দেখি, যা শুনি, একা একা কথা বলি...

Prologue 

আমরা সমাজবদ্ধ জীব। সামাজিক নিয়মেই আমরা একে অপরের সাথে কথা বলি, মেলামেশা করি। সময়ের সাথে সাথে কারোর কারোর সাথে বেশি বন্ধুত্ব হয়, বেশী যোগাযোগ থাকে, আবার কারোর কারোর সাথে দূরত্ব তৈরী হয়। কারোর কারোর সাথে শুধু সৌজন্যের সম্পর্ক থাকে, কারোর কারোর সাথে শুধুই পেশাগত সম্পর্ক থাকে। সম্পর্ক যে ধরণেরই হোক না কেনো, প্রত্যেক টা সম্পর্কেরই একটা অর্থ আছে বলে আমি মনে করি, অন্ততঃ থাকা উচিৎ। সে কারণেই আমরা একে অপরের খবর নিই, একে অপরের সাথে কথা বলি ইত্যাদি। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে আড্ডা, গল্প, তর্ক, যুক্তি, প্রতিযুক্তি, মতবিনিময়, আলাপচারিতা সবকিছুই হয়। সেখান থেকে কত কিছু জানা যায়, শেখা যায়, বোঝা যায়। কতজন কে নতুন ভাবে চেনা যায়। পরে যখন সেগুলো নিয়ে ভাবি, তখন একটা মিশ্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়। কখনো ভালো লাগার, কখনো খারাপ লাগার। সাম্প্রতিক অতীতে বেশ কিছু বছর ধরে দেখছি ভালো লাগা বা খারাপ লাগা কোনো অনুভূতিই আর বিশেষ হচ্ছে না। তার জায়গায় হতাশ লাগছে, নিরাশ লাগছে আর ক্রমশঃ যেনো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি অন্যদের থেকে। আরো একা হয়ে পড়ছি। শুধু যে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বা কথোপকথন থেকেই নিরাশ বোধ করছি তা না, চারপাশে ঘটে চলা সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, সংবাদ মাধ্যমে সেগুলোকে দেখানোর ধরণধারণ, ব্যক্তিগত জীবনে ও সামাজিক মাধ্যমে সেসব ঘটনার প্রতি পরিচিত, আধা - পরিচিত ও অপরিচিত লোকজনের প্রতিক্রিয়া - এসব কিছুই বড় প্রভাবিত করেছে ও করে।
সেই সব অনুভূতি গুলোকেই লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছি এখানে। কোনোরকম তিক্ততায় আমি বিশ্বাসী নই। "মানুষ বদলায়, তাই সে সুন্দর" - এই বিশ্বাসকেই আঁকড়ে ধরে রাখতে চাই।
-------------------------------------------------------------------------
পর্ব ৩

এবারে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি নিয়ে নানা জনের নানা আলোচনা, নানা মতামত শুনলাম। মিডিয়া প্রধানত দুটো রাজনৈতিক দলের প্রচার করছে দেখলাম। আর বাম দল গুলো কে নিয়ে এবারে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথাবার্তা শুনলাম!!

কিছুদিন আগে এক পরিচিত জনের সাথে কথা হচ্ছিলো। নানা বিষয়েই কথা হয় মাঝেসাঝে।হঠাৎ সেদিন তাঁর কাছ থেকে জানতে পারলাম বামমনষ্ক লোকজন কে 'সঠিক বামপন্থী' হতে গেলে তাদের পার্টিমেম্বারশীপ থাকতে হয়!! উনি বামপন্থী মানেই সিপিআইএম বোঝেন আর কি! অনেক টা এই রকম বোঝাল যে ধরুন আপনি তখনই নন্দীগ্রাম বা সিঙ্গুরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর শিল্প স্থাপনের চেষ্টা করার কথা আলোচনা করতে পারেন যদি আপনার পার্টিমেম্বারশীপ থাকে! বোঝ ঠেলা। উনি বোঝালেন যে ঐ শিল্প স্থাপন করতে গিয়েই পার্টি টা নির্বাচনে হেরে গেছিল আর তারপরই পার্টি টা শেষ হয়ে গেলো। মানে যে বা যারা ওই শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এসব বলেছিলো তারাই পার্টিটাকে শেষ করে দিলো আর কি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর দিকেই ইঙ্গিত ছিল মূলতঃ। স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে আমাকেও ব্যক্তিগত আক্রমণ করলো খানিক। আমি আর পাল্টা জিজ্ঞেস করিনি তাহলে এবারের নির্বাচনেও সেই পার্টি কেনো শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের লাইনেই চলছে যদি সেটা ভুল হয়ে থাকে? সব রাজনৈতিক দল গুলোই বলে সাধারণ মানুষ তাদের সাথে আছে। তাহলে কি প্রত্যেক সাধারণ মানুষকেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের মেম্বার হতেই হবে? কি জানি! তবে ওই পার্টিমেম্বারশীপ ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হলো বলে একটু বোঝার চেষ্টা করলাম। তার ব্যাখ্যা টা এই রকম যে মেম্বারশীপ থাকলে লেভি দিতে হয়, অর্থাৎ টাকা না দিলে আপনার কিছুই বলার অধিকার নেই। ধরুন কেউ যদি চাঁদা দেয়, তাহলে হবে না কিন্তু। লেভিই দিতে হবে! একজন পেশাদার রাজনৈতিক কর্মীর মুখে একথা শুনলে হয়তো এতটা ধাক্কা খেতাম না কারণ Leninist Vanguard পার্টি গুলোর একটা সমস্যা হল যে তারা পার্টি মেম্বারশীপ কে অত্যধিক গুরুত্ব দেয়। যাই হোক, কারা কিভাবে সিপিআইএম পার্টি মেম্বারশীপ পেয়েছিলো আর তার ফল কি হয়েছিলো, সেসব নিয়ে তাঁর কোনরকম মাথাব্যাথা দেখলাম না। সব ঘেঁটে ঘ হয়ে গেলো। কিছুদিন আগেই 'ধূসর মস্কো' পড়েছি, শুধু বার বার মনে পড়ছিল যে শুধুমাত্র অতিরিক্ত ও অনায্য সুযোগ সুবিধে পাওয়ার লোভে কোনো ভাবে একটা পার্টি মেম্বারশীপ জোগাড় করার কি উন্মত্ত প্রতিযোগিতা, যার ফল - স্বয়ং লেনিনের দেশেও একদিন কম্যুনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়েছিলো! এ হেন পার্টি মেম্বার কে কখনো কখনো নিজেকে অরাজনৈতিকও দেখাতে হয়!!
গত পর্বে স্ট্রাকচারড ন্যারেটিভ কি ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সেটা বলছিলাম। সে প্রসঙ্গে বলি, আর একদিন অন্য একজন কথা প্রসঙ্গে বললেন পশ্চিমবঙ্গে বামেদের এমনই দুরাবস্থা যে বুদ্ধ বাবু কে এখনও এই বয়সে বামেদের হয়ে বিবৃতি দিতে হয় বা অডিও বার্তা দিতে হয়। আমি তো শুনে তাজ্জব! একজন পার্টিকর্মী, আদ্যপান্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি মাস দেড়েক আগেই বলেছিলেন অসুস্থ অবস্থায় ঘরে বন্দি হয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ না করতে পেরে অস্থির বোধ করছেন, তিনি তাঁর পার্টি কে ভোট দিতে আবেদন করবেন বা পার্টি তাঁকে অনুরোধ করবে এটাই তো স্বাভাবিক। যে কোনও রাজনৈতিক দলের প্রবীণ সদস্যই তা করতে পারেন। করেনও। কিন্তু বাম দলের কেউ করলেই সমস্যা! ওই যে বললাম 'স্ট্রাকচারড ন্যারেটিভ'! আবার ঘেঁটে ঘ হয়ে গেলাম। প্রচারে বা প্রোপাগান্ডায় মগজধোলাই কি একেই বলে?

সুমন সিনহা 
0৯/০৪/২০২১

Sunday, April 25, 2021

পর্ব - ২

যা দেখি, যা শুনি, একা একা কথা বলি...

Prologue 

আমরা সমাজবদ্ধ জীব। সামাজিক নিয়মেই আমরা একে অপরের সাথে কথা বলি, মেলামেশা করি। সময়ের সাথে সাথে কারোর কারোর সাথে বেশি বন্ধুত্ব হয়, বেশী যোগাযোগ থাকে, আবার কারোর কারোর সাথে দূরত্ব তৈরী হয়। কারোর কারোর সাথে শুধু সৌজন্যের সম্পর্ক থাকে, কারোর কারোর সাথে শুধুই পেশাগত সম্পর্ক থাকে। সম্পর্ক যে ধরণেরই হোক না কেনো, প্রত্যেক টা সম্পর্কেরই একটা অর্থ আছে বলে আমি মনে করি, অন্ততঃ থাকা উচিৎ। সে কারণেই আমরা একে অপরের খবর নিই, একে অপরের সাথে কথা বলি ইত্যাদি। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে আড্ডা, গল্প, তর্ক, যুক্তি, প্রতিযুক্তি, মতবিনিময়, আলাপচারিতা সবকিছুই হয়। সেখান থেকে কত কিছু জানা যায়, শেখা যায়, বোঝা যায়। কতজন কে নতুন ভাবে চেনা যায়। পরে যখন সেগুলো নিয়ে ভাবি, তখন একটা মিশ্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়। কখনো ভালো লাগার, কখনো খারাপ লাগার। সাম্প্রতিক অতীতে বেশ কিছু বছর ধরে দেখছি ভালো লাগা বা খারাপ লাগা কোনো অনুভূতিই আর বিশেষ হচ্ছে না। তার জায়গায় হতাশ লাগছে, নিরাশ লাগছে আর ক্রমশঃ যেনো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি অন্যদের থেকে। আরো একা হয়ে পড়ছি। শুধু যে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বা কথোপকথন থেকেই নিরাশ বোধ করছি তা না, চারপাশে ঘটে চলা সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, সংবাদ মাধ্যমে সেগুলোকে দেখানোর ধরণধারণ, ব্যক্তিগত জীবনে ও সামাজিক মাধ্যমে সেসব ঘটনার প্রতি পরিচিত, আধা - পরিচিত ও অপরিচিত লোকজনের প্রতিক্রিয়া - এসব কিছুই বড় প্রভাবিত করেছে ও করে।
সেই সব অনুভূতি গুলোকেই লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছি এখানে। কোনোরকম তিক্ততায় আমি বিশ্বাসী নই। "মানুষ বদলায়, তাই সে সুন্দর" - এই বিশ্বাসকেই আঁকড়ে ধরে রাখতে চাই।
-------------------------------------------------------------------------
পর্ব ২

খুব দ্রুত আমাদের চারপাশের জগৎ টা, চারপাশের পরিবেশ টা, চারপাশের মানুষজন পাল্টে যাচ্ছে। পাল্টানোই জগতের নিয়ম। কিন্তু এই পাল্টানোর বা বদলানোরও একটা চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য আছে। পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই মূল চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য পাল্টাতে পারে না। যদি সেটা হয়, তাহলে তা অবশ্যই উদ্বেগের ও দুশ্চিন্তার। যেমন সময়ের সাথে সাথে সাদা রং সাদা'ই বা কালো রং কালো'ই থাকে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন "আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুনি উঠল রাঙা হয়ে"। অর্থাৎ এই চেতনাই ঠিক করে দেয় কোনটা সত্য আর কোনটা অসত্য, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল, কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ। সত্য সবসময়ই অনন্য (unique) তাই ইংরেজিতেও বলা হয় ' to tell the truth but to tell a lie'. ঠিক - ভুল বা ভালো - খারাপ নিয়ে একটা তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবকাশ সবসময়ই ছিল। কিন্তু তাত্ত্বিক দিকটি বাদ দিয়ে প্রতিদিনকার জীবনে কোনো মন্তব্য বা কোনো আচার - আচরণ বা কোনো ঘটনা ঠিক না ভুল, ভালো না খারাপ সেটা সাধারণ জ্ঞান দিয়েই বিচার করা হয়। অর্থাৎ আমাদের চেতনাবোধ বুঝতে শেখায় কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ বা কি ঠিক, কি ভুল। ছোটবেলা থেকেই এই ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা, চেতনাবোধ তৈরী হয় আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বলতে বাড়ির পরিবেশ, স্কুলের পরিবেশ, পাড়ার পরিবেশ, খেলার পরিবেশ ইত্যাদি। অর্থাৎ আমাদের চারপাশের সামাজিক পরিবেশে আমরা কি শুনছি বা কি দেখছি বা কি পড়ছি সেখান থেকেই ভালোমন্দের ধারণা তৈরী হতে শুরু করে। বড় হতে শুরু করলেই কোনো ঘটনাকে ভালোমন্দর নিরিখে বিচার করতে বসলে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা - সমালোচনা ও পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল (আজকের সময়ে এই শব্দবন্ধ টাই ব্যবহার করা নিরাপদ মনে হলো) কি প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন বা ব্যাখ্যা করছেন তার ওপরই ভরসা করতে হতো। জনমত গঠনে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ছোটবেলায় রচনা লিখে নম্বর পেয়ে সেসব এখন অতীত হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক অতীত থেকে বর্তমান সময়ে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন খেয়াল করা যাচ্ছে তা হলো সংবাদমাধ্যম গুলোর ওপর রাজনৈতিক আগ্রাসন ও সংবাদমাধ্যম গুলির রাজনৈতিক নির্ভরতা। যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচুর অর্থবল, তাদের হয়ে প্রচার ও প্রোপাগান্ডা স্বভাবতই বেশি। পাবলিক ইন্টেলেকচুয়ালরাও সংবাদমাধ্যম গুলোতে ব্রাত্য। যেটা দেখা যাচ্ছে তা হলো ভুল কে ঠিক বা খারাপ কে ভালো প্রতিপন্ন করার ব্যাপক একটা প্রচার যা সাধারণ মানুষের মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থে ক্রমাগত, প্রতিনিয়ত আঘাত করে চলেছে। ন্যারেটিভ বদলে দেওয়ার এক প্রাণপণ চেষ্টা। ধর্মীয় উস্কানি, সাম্প্রদায়িকতা, বিভাজনের রাজনীতিকে মান্যতা দেওয়ার চেষ্টা। এক শ্রেণীর 'সুশীল সমাজের' প্রতিনিধি এর সাথে যুক্ত হয়েছে। সাধারণ মানুষ এতে কতটা প্রভাবিত হচ্ছেন বা এর সামাজিক প্রভাব কি হবে তা ভবিষ্যৎ বলবে কারণ সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহকে বর্তমানের নিরিখে বিচার করতে গেলে অনেকসময়ই অন্ধের হস্তীদর্শন হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে একটা। কিন্তু আমাদের চারপাশের অনেক শিক্ষিত লোকজনকেও দেখছি এই নতুন রাজনৈতিক ন্যারেটিভ বিশ্বাস করতে, বলতে ও প্রচার করতে। সাধারণ জ্ঞানে ও চেতনায় যে সব ঘটনা বা কথাবার্তা বা বক্তব্য কে খারাপ বলেই জেনে এসেছি, আজ অনেকের কাছেই সেগুলো 'তেমন খারাপ কিছু' লাগছে না। তারা যে কোনো উপায়ে সেগুলোকে মান্যতা বা স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং সেটা প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে প্রতিযুক্তিতে whataboutery এর আশ্রয় নিচ্ছেন। অনেক সময় কোনো বক্তব্যের থেকে একটি বা দুটি আপাত - নিরপরাধ শব্দকে বেছে নিয়ে সেই বক্তব্যকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা হচ্ছে। একটা শব্দকে কোন অবস্থায় কি প্রেক্ষিতে কি ভাবে কি অর্থে কোথায় প্রয়োগ বা ব্যবহার করা হচ্ছে, তারপর নির্ভর করে সেটা ভালো না খারাপ বা ঠিক না ভুল। যেমন 'রগড়ে' দেওয়া আপাতদৃষ্টিতে একটি নিরপরাধ শব্দ। জামাকাপড় কাচবার সময় আমরা হামেশাই রগড়াই। কিন্তু কেউ যদি কোনো শিল্পী কে রগড়ে দেওয়ার হুমকি দেন, তখন কি বলা যায় 'তেমন খারাপ কি বললো'! এক রাজনৈতিক প্রার্থী অন্য দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কে কন্ডোমের দোকান খুলতে বলছে! দুজনেই আবার মহিলা! (আজকাল আবার মহিলা কে মহিলা বললে প্রিভিলেজ নেওয়া বোঝায়!) কোনো সামগ্রিক প্রতিবাদ নেই ! কন্ডোম তো আর নিষিদ্ধ নয় বাজারে, দোকানে পাওয়া যায়, তাই সেই বক্তব্য খারাপ কি করে হতে পারে! জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলের টক শো তে কোনো রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে হুমকি, আকথা - কুকথা বলে যাচ্ছেন আর সঞ্চালক দন্ত বিকশিত করে হাসছেন! বক্তাদের মধ্যে কালেভদ্রে দু একজন প্রতিবাদ করছেন, বাকি বক্তারা তখন হয় নিশ্চুপ দর্শক নয় ইনিয়েবিনিয়ে ন্যারেটিভ বদলে দেওয়ার সুচারু শিল্পে ব্যস্ত। হলভর্তি দর্শকদের সেই হুমকি, আকথা - কুকথা হজম করতে হচ্ছে। কেউ প্রশ্ন করলে আরো কুৎসিত হুমকি ও আক্রমণ। আর টিভির সামনে বসা হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ দর্শকদের অসহায় ভাবে সেসব শুনতে হচ্ছে, দেখতে হচ্ছে। আরো বিভিন্ন বিষয়ে নানাভাবে ভালো-খারাপ, ঠিক - ভুল কে গুলিয়ে দেওয়ার ন্যারেটিভকে ফাইন আর্টসের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অবিরত চেষ্টা করা হচ্ছে। কিছুদিন আগে একজন কে বলতে শুনলাম জাতপাত নিয়ে রাজনীতি যখন হয় বা হয়েছে তখন ধর্ম নিয়ে রাজনীতির জন্য এত কথা কেনো!! দুটোই খারাপ কিন্তু একটা খারাপ কে দিয়ে অন্য একটা খারাপ কে জাস্টিফাই করার কি সুন্দর প্রচেষ্টা! দুটো খারাপের মধ্যে কোনটা বেশী ভয়ঙ্কর সেটাই ঘেঁটে ঘ হয়ে যাচ্ছে আজকাল। সাম্প্রদায়িকতাকেও মান্যতা দেওয়ার কি সূক্ষ্ম কৌশল! বিভাজনের রাজনীতি, বিভেদের রাজনীতি আমাদের জীবনের অঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। মানুষে মানুষে বিভাজন! এর ফলে ক্ষমতালোভী, নীতিআদর্শহীন কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের বা কিছু নেতাদের বা মুষ্টিমেয় কিছু লোকজনের লাভ হতে পারে, কিন্তু পারস্পরিক পরিচিতি বা বন্ধুত্বের সম্পর্কে যে বিশ্বাস ও ভালোবাসার জায়গাগুলো ধাক্কা খাচ্ছে, সেটা কি কম ক্ষতিকর কিছু? মানুষ কে নিয়েই তো সমাজ। সামাজিক পরিবেশ, সামাজিক পরিকাঠামো, সামাজিক সুস্থিতি কে নষ্ট করে কি কখনো মানুষের ভালো হতে পারে?

সুমন সিনহা 
০৬/০৪/২০২১


পর্ব ১

যা দেখি যা শুনি একা একা কথা বলি... 

Prologue 

আমরা সমাজবদ্ধ জীব। সামাজিক নিয়মেই আমরা একে অপরের সাথে কথা বলি, মেলামেশা করি। সময়ের সাথে সাথে কারোর কারোর সাথে বেশি বন্ধুত্ব হয়, বেশী যোগাযোগ থাকে, আবার কারোর কারোর সাথে দূরত্ব তৈরী হয়। কারোর কারোর সাথে শুধু সৌজন্যের সম্পর্ক থাকে, কারোর কারোর সাথে শুধুই পেশাগত সম্পর্ক থাকে। সম্পর্ক যে ধরণেরই হোক না কেনো, প্রত্যেক টা সম্পর্কেরই একটা অর্থ আছে বলে আমি মনে করি, অন্ততঃ থাকা উচিৎ। সে কারণেই আমরা একে অপরের খবর নিই, একে অপরের সাথে কথা বলি ইত্যাদি। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে আড্ডা, গল্প, তর্ক, যুক্তি, প্রতিযুক্তি, মতবিনিময়, আলাপচারিতা সবকিছুই হয়। সেখান থেকে কত কিছু জানা যায়, শেখা যায়, বোঝা যায়। কতজন কে নতুন ভাবে চেনা যায়। পরে যখন সেগুলো নিয়ে ভাবি, তখন একটা মিশ্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়। কখনো ভালো লাগার, কখনো খারাপ লাগার। সাম্প্রতিক অতীতে বেশ কিছু বছর ধরে দেখছি ভালো লাগা বা খারাপ লাগা কোনো অনুভূতিই আর বিশেষ হচ্ছে না। তার জায়গায় হতাশ লাগছে, নিরাশ লাগছে আর ক্রমশঃ যেনো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি অন্যদের থেকে। আরো একা হয়ে পড়ছি। শুধু যে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বা কথোপকথন থেকেই নিরাশ বোধ করছি তা না, চারপাশে ঘটে চলা সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, সংবাদ মাধ্যমে সেগুলোকে দেখানোর ধরণধারণ, ব্যক্তিগত জীবনে ও সামাজিক মাধ্যমে সেসব ঘটনার প্রতি পরিচিত, আধা - পরিচিত ও অপরিচিত লোকজনের প্রতিক্রিয়া - এসব কিছুই বড় প্রভাবিত করেছে ও করে।
সেই সব অনুভূতি গুলোকেই লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছি এখানে। কোনোরকম তিক্ততায় আমি বিশ্বাসী নই। "মানুষ বদলায়, তাই সে সুন্দর" - এই বিশ্বাসকেই আঁকড়ে ধরে রাখতে চাই।
-------------------------------------------------------------------------
পর্ব ১

প্রায় অনেক বছর ধরেই শুনে আসছি পশ্চিমবঙ্গে আর কিছুই নেই। সব শেষ হয়ে গেছে। এমনিতেই পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ একটি অপয়া সংখ্যা কারণ পশ্চিমবঙ্গের যা কিছু খারাপ তা ঐ ৩৪ এর জন্যই। মিডিয়া, কিছু রাজনৈতিক দল ও নির্লজ্জ সুবিধাবাদী বেশকিছু ভদ্র মহোদয় মহোদয়াগণ প্রচার ও প্রোপাগান্ডায় ৩৪ কে এমন একটা ফাইন আর্টসের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে তার আগের ৩০ বা পরের ১০ বছরেও যে একটা পশ্চিমবঙ্গ ছিল, সেটাই অনেকে ভুলে গেছেন। একটা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কুৎসা, মিথ্যাচার, ষড়যন্ত্র করতে করতে সবাই একটা জাতির কথা বেমালুম ভুলে গেলো! এবারে বিধানসভা নির্বাচনের আগে অভূতপূর্ব প্রচার যে বাংলায় ভোটার ছাড়া আর কিছুই নেই! একটা দ্বিধাবিভক্ত জাতিকে নিয়ে আবার টানাপোড়েন আর তাতে সবচেয়ে বেশি সামিল বাঙালি মিডিয়া! এর পেছনে উদ্দেশ্য বা কারণ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিরা বিচার বিশ্লেষণ করবেন। কিন্তু এই যে পশ্চিমবঙ্গে আর কিছু নেই, এই "কিছু" টা কি কি? কর্মসূত্রে বাংলার বাইরে থাকি বলে এই "কিছু"র একটু আন্দাজ পেয়েছি যেমন 'বাংলায় কি আছে আর?', 'বাঙালিরা কি কাজ করে?', 'বাঙালি রা কিন্তু খুব ফাঁকিবাজ', 'ওখানে তো সরকারি চাকরি বাকরি আর কিছুই নেই', 'বাঙালিরা তো সবাই এখন বাংলার বাইরে' ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছু প্রবাসী বাঙালিকেও আমি এগুলো বলতে শুনেছি। বাংলা ছেড়ে বাঙালিরা বাংলার বাইরে এটা বাজারে খুব চলে। এই ব্যাপার টা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগে আমার। প্রথমে এই ব্যাপার টা একটু দেখা যাক।

প্রত্যেক টা রাজ্যেরই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, মূলতঃ সেটা জাতিগত স্বাতন্ত্র্য যা সেই রাজ্যের অধিবাসীদের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও যাপন নির্ধারণ করে। পশ্চিমবঙ্গকে অন্য রাজ্যের সাথে তুলনা করতে গেলে এই স্বাতন্ত্র্যের কথাটি সবসময় মাথায় রাখতে হবে। এখন পশ্চিমবঙ্গের ছেলে মেয়েদের একাডেমিকস্-এ থাকার প্রবণতা সবসময়ই বেশি। তার একটা কারণ বাংলায় সরকারি বা সরকার অনুমোদিত স্কুল কলেজের সংখ্যা অন্য রাজ্যের থেকে অনেক বেশি। স্বভাবতই, বাঙালি ছেলে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার প্রতি ঝোঁক অনেক বেশি। দেশের নামকরা উচ্চশিক্ষা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান (পশ্চিমবঙ্গ সহ) গুলোর দিকে নজর দিলেই সেটা খুব পরিষ্কার বোঝা যায়। এখন এই সমস্ত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুলোতেও তো শিক্ষক, শিক্ষিকা, বিজ্ঞানী পদে নিয়োগ হয়। নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় যদি বাঙালি ছেলেমেয়েরা সেসব পদে নির্বাচিত হয়, তাহলে তো সেটা গর্বের। নাকি তারা সেসব চাকরি করবে না যেহেতু লোকজন বলবে বাংলা ছেড়ে বাঙালিরা বাইরে? আরো একটা ব্যাপার ভাবতে হবে। উচ্চশিক্ষা মানেই কিন্তু নির্দিষ্ট থেকে নির্দিষ্টতর বিষয়ে পড়াশোনা করা। ধরুন কেউ কোনো বিষয়ে পিএইচডি করে সেই বিষয়ের ওপরে আরো গবেষণা করতে পোষ্টডক্টরেট স্তরে পড়াশোনা করলো। দেশে বা বিদেশে কোথাওই হতে পারে। এখন তিনি এমন কোনো বিষয়ে গবেষণা করেছেন যে বিষয়ের ওপর কাজ দেশের হাতেগোনা দু একটি প্রতিষ্ঠানে হয় এবং ঘটনাচক্রে পশ্চিমবঙ্গে সেই ধরণের প্রতিষ্ঠান নেই। খুব স্বাভাবিক ভাবে তিনি চেষ্টা করবেন সেই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবার যেখানে তাঁর বিষয়ের ওপর কাজ হয়। এটাকে কি বাঙালি বাংলার বাইরে চলে যাচ্ছে হিসেবে ব্যাখ্যা করা টা যুক্তিসঙ্গত? আবার অনেকের ব্যাক্তিগত ইচ্ছে বা স্বপ্ন থাকে নির্দিষ্ট কোনও প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হতে, সে দেশেই হোক বা বিদেশে। তিনি যদি তাতে সক্ষম হোন, সেটা আনন্দের ও প্রেরণার এবং বাঙালি হিসেবে গর্বের। বিদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানে কেউ থাকলে ব্রেনড্রেন হয়ে গেলো বা দেশের কি লাভ হল বলে হাহুতাস, আর দেশে ফিরে এলে বাংলার বাইরে বলে আহা উহু। কি কিউট একটা ব্যাপার!

এবার উচ্চশিক্ষার কথা ছেড়ে অন্য ক্ষেত্র গুলো একটু দেখা যাক। ভারত একটা স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ যার একটি ফেডারেল গঠন আছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন পদে বিভিন্ন রকম চাকরির জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে যোগ্যতা অনুযায়ী আবেদন করা যায় ও সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার (বা ইন্টারভিউ) মাধ্যমে উপযুক্ত প্রার্থীদের নির্বাচন করা হয়। সেটা কোনো অ্যাকাডেমিক ইন্সটিটিউট হতে পারে বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান হতে পারে বা কোনো বিভাগ বা কোনো দপ্তর বা সাব অর্ডিনেট অফিস হতে পারে। যে কোনো রাজ্যের প্রার্থীরা সেসব চাকরির জন্য আবেদন করতে পারে ও অনেক ক্ষেত্রে সেইসব চাকরির পূর্বশর্ত হয় যে নির্বাচিত হলে ভারতের যে কোনও রাজ্যে প্রার্থী কে চাকরিসূত্রে থাকতে হতে পারে। এমনও সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে যা ভারতবর্ষের মধ্যে একটি মাত্র রাজ্যেই আছে। আর শুধু কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি নয়, বিভিন্ন পাবলিক সেক্টর কোম্পানি বা প্রাইভেট কোম্পানি আছে যারা সর্বভারতীয় ভাবে নিয়োগ করে। পশ্চিমবঙ্গ কি ভারতের বাইরে যে বাঙালি ছেলেমেয়েরা সেসব চাকরিতে আবেদন করবে না? তাদের নির্বাচিত হয়ে চাকরি করা টা কি 'বাঙালি বাংলা ছেড়ে বাইরে চলে যাচ্ছে' বলা যায়? অনেক ছেলেমেয়ে আছে যারা নির্দিষ্ট কোনো পাবলিক সেক্টর বা প্রাইভেট কোম্পানির সাথে যুক্ত হতে চায়। এরকম তো হয় যে কেন্দ্রীয় সরকারি বা পাবলিক সেক্টর বা প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি পেয়ে কারোর কারোর কর্মস্থল পশ্চিমবঙ্গ। এমনিতেই ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বাঙালিদের উল্লেখযোগ্য ভাবে কম নির্বাচিত হওয়া নিয়ে (যদিও তার কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে ধরা হয়) একটা আক্ষেপ আছেই। বাঙালি বাইরে না গেলে 'ঘরকুনো', আর বাইরে গেলে হায় হায় সব শেষ হয়ে গেলো!
আরো একটি ব্যাপার বলি। ধরুন কোনো বাঙালি ছেলে বা মেয়ে নতুন কোনো চাকরি পেয়ে বাংলার বাইরে কোথাও যোগ দিলো। তারপর সে বিয়ে-থাওয়া করলো। এখন তার সঙ্গীনি বা সঙ্গী টি যদি সেই শহরে চাকরির চেষ্টা করে বা পেয়ে যায়, সেটাই তো সাধারণ জ্ঞানে স্বাভাবিক। সেটা কি 'বাংলায় কিছুই নেই' হতে পারে? ব্যতিক্রম থাকতেই পারে কিন্তু ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হতে পারে না।

এবারে দেখা যাক 'ওখানে তো সরকারি চাকরি বাকরি আর কিছুই নেই' এর দিকে। বিগত দশ বছর বাদ দিলে কি কখনো পশ্চিমবঙ্গে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগের বিভিন্ন পদে, পুলিশে, দমকলে, হাসপাতালের বিভিন্ন পদে নিয়মিত নিয়োগ বন্ধ ছিল? আর সেইসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কখনো লাগামছাড়া দুর্নীতি বা স্বজন পোষন বা ঘুষের অভিযোগ উঠেছিল? আবারো বলছি ব্যতিক্রম হয়তো কিছু ক্ষেত্রে ছিল (সেটা কখনোই কাম্য নয়), কিন্তু তাকে সাধারণীকরন করলে সত্যের অপলাপ হবে। আর অন্য রাজ্যের সাথে পশ্চিমবঙ্গের তুলনা করলে সেই রাজ্যের সরকারি চাকরির নিয়োগে বা স্কুল, কলেজে নিয়োগে কি হয় বা কি ভাবে হয় সেই ধারণা অবশ্যই রাখতে হবে।
'বাংলায় আর কিছুই নেই' এর মধ্যেও গতকাল কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ARWU (Academic Ranking of World Universities) ranking এ প্রথম হয়েছে। গতবছর কেন্দ্রীয় সরকার প্রকাশিত ভারতের প্রথম দশটি শ্রেষ্ঠ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যাদবপুর (তৃতীয় স্থান) ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (পঞ্চম স্থান) ছিল। দুটোই রাজ্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়াও কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে খড়্গপুর আই আই টি (প্রথম স্থান ) ছিল যেটা পশ্চিমবঙ্গে। এখন বাঙালিরা যদি 'কাজই না করে' বা 'ফাঁকিবাজি' করে, তাহলে এই প্রতিষ্ঠান গুলো চলছে কি করে বা চালাচ্ছে কারা? এই প্রতিষ্ঠান গুলো ছাড়াও অন্যান্য একাধিক অফিসে বা স্কুলে বা কলেজে বহু মানুষ সৎ ভাবে পরিশ্রম ও দক্ষতার সাথে কাজ করে চলেছে যা আড়ালেই থেকে যায়।
এরকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। কিন্তু সবকিছু ছেড়ে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতার লোভে 'বাংলায় আর কিছুই নেই, সব শেষ হয়ে গেছে' বলে যে তীব্র ও সচেতন প্রচার চালানো হচ্ছে, আমরাও যদি সেটাই বিশ্বাস করতে শুরু করি তাহলে বুঝতে হবে এই পোস্টট্রুথ পলিটিক্সের যুগে আমাদের ভালোই মগজধোলাই হয়েছে।

সুমন সিনহা 
০৩/০৪/২০২১

জীবনানন্দ দাশ

আজ "নির্জনতম কবি"র মৃত্যুদিন। বিবরবাসী এই মানুষটির সোচ্চার স্বপ্ন ছিলো "কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে"। ভীষন ক্লা...