Showing posts with label স্মৃতিকথা / Reminiscence. Show all posts
Showing posts with label স্মৃতিকথা / Reminiscence. Show all posts

Monday, April 8, 2024

দিনগুলি মোর - ১

এখানকার বর্ষার চরিত্র পশ্চিমবঙ্গের বর্ষার চরিত্র থেকে অনেকটাই আলাদা। প্রায় আড়াই তিন মাস ধরে বৃষ্টি পড়তেই থাকে - কখনো এক নাগাড়ে, কখনো থেমে থেমে - কখনো খুব জোরে আবার কখনো মাঝারি মাপের। রোদের দেখা প্রায় মেলেনা বললেই চলে। মাঝে মধ্যে একটু হাল্কা রোদ দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায়। স্থায়িত্ব খুব কম। তার মধ্যে দিনে রাতে বৃষ্টি চলতেই থাকে। তবে পাওয়ার কাট বা লোডশেডিং খুব কমই হয়। হ'লেও তাড়াতাড়িই চলে আসে। তবে ব্যতিক্রম যে মাঝে মধ্যে হয় না তা নয়।

এই কিছুদিন আগে একদিন সারাদিন ধরেই বৃষ্টি পড়ছে। ভরা বর্ষা যাকে বলে আর কি। সন্ধ্যের পর থেকে বৃষ্টির তীব্রতা আরো বাড়লো এবং ঝুপ করে লোডশেডিং। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরও যখন কারেন্ট এলো না, বুঝলাম ভোগাবে। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম - চারিদিকে নিকষ অন্ধকার আর অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টি পড়েই চলেছে। বৃষ্টির শব্দের একটা নিজস্ব ছন্দ আছে - অনুভূতি তে ধরা দেয়। বহুবছর পর সন্ধ্যারাতে একই সাথে লোডশেডিং এবং বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি আমাকে নিয়ে চলে গেলো সুদূর অতীতের সেইসব সন্ধ্যায় যখন বর্ষাকালে সন্ধ্যায় ঝমঝম বৃষ্টির সাথে লোডশেডিং ছিল নিত্যদিনের ঘটনা এবং খুবই সাধারণ ব্যাপার।
তা আজ থেকে প্রায় বছর পঁয়ত্রিশ আগের সেসব দিনের কথা আজও স্মৃতিতে পুরোপুরি ধূসর হয়ে যায় নি। মফস্বল শহরের পৈতৃক বাড়ি অনেকটা জায়গা জুড়ে হলেও বেশীরভাগটাই উন্মুক্ত জায়গা ছিল। আমাদের একটা বড় ঘর ছিল, আর তার সাথে লাগোয়া একটা ছোটো ঘর। সেই ছোটোঘরটাই তখন রান্নাঘর ছিল। পরে অবশ্য বাবা আলাদা একটা রান্নাঘর বানিয়েছিল। বড় আর ছোট ঘরের সামনেটা জুড়ে বেশ বড় একটা লাল রঙের শানবাঁধানো বারান্দা। বারান্দা থেকে সিড়ি দিয়ে নামলে ইঁটবাঁধানো বিশাল বড় আয়তাকার একটা উঠোন। উঠোনের দক্ষিণ পূর্ব কোণায় আর একটি বড় ঘর, একটি ছোটো ঘর ও দুটো ঘরের সাথেই লাগোয়া একফালি একটা খালি জায়গা ছিল। উঠোনের ঠিক পূর্বে একটি কুয়ো ছিল। ঐ কুয়ো থেকেই জল তোলা হতো তখন। ঐ লাল শানবাঁধানো বারান্দাটা গ্রিল দিয়ে ঘেরা ছিল না। পরে অবশ্য গ্রিল বসানো হয়। বারান্দায় একটা কাঠের চৌকি রাখা থাকতো আর চৌকির পাশে বেশ উঁচু একটা টেবিল থাকতো। যখন বৃষ্টি পড়তো তখন আমি আর দিদি চৌকির ওপর জড়োসড়ো হয়ে বসে বৃষ্টি দেখতাম। এলোমেলো হাওয়ায় বৃষ্টির ছাঁট এসে যখন গায়ে লাগত, তখন কি যে একটা রোমাঞ্চ হতো আমার! একটু বেশি বৃষ্টি হলেই উঠোনে জল জমে যেতো। কাগজের নৌকা বানিয়ে বারান্দার সিড়িতে বসে উঠোনের জমা জলে নৌকো ভাসানোয় এক অনাবিল আনন্দ ও চরম উত্তেজনা ছিল। বৃষ্টি থামলেই উঠোনের জমা জলে নেমে লাফিয়ে লাফিয়ে চারিদিকে জল ছেটানো ছিল বর্ষার দিনে আমাদের প্রধান খেলা।
এরকম বৃষ্টির দিনে সাধারণতঃ কারেন্ট থাকতো না, বিশেষত সন্ধ্যার পর থেকেই। বৃষ্টির দিনগুলোতে লেখাপড়া করতে মন লাগতো না কিন্তু সন্ধ্যা হ'লেই পড়তে বসা ছিল বাধ্যতামূলক। মাটিতে শতরঞ্জি পেতে একটা হারিকেনের এক দিকে আমি আর অন্য দিকে দিদি। চারপাশে বইখাতা। দুটো হারিকেন ছিল। একটা হারিকেন নিয়ে মা ছোটো ঘরটাতে রান্নাবান্না, সংসারের কাজ এসব করতো আর অন্য হারিকেন টা নিয়ে বড় ঘরের মেঝে তে আমি আর দিদি। বাইরে বৃষ্টি, অন্ধকার আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। হারিকেনের আলো ঘরের রংচটা দেয়ালের ওপর কেমন একটা আলো আঁধারি সৃষ্টি করতো। মাঝে মাঝে ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে বাইরের বৃষ্টি দেখতাম। অন্ধকারের মধ্যে বৃষ্টির শব্দটাই শুধু শুনতে পেতাম। এখনও বৃষ্টির শব্দ আমায় টানে।
হারিকেনের আলো কার দিকে বেশি পড়ছে সেই নিয়ে আমার আর দিদির ঝগড়া লেগেই থাকতো। কিছু সময় পর পর দুজনেই চেঁচিয়ে মা কে নালিশ জানাতাম "মা, ও নিজের দিকে হারিকেনটা বেশি ঘুরিয়ে নিচ্ছে"। বেশ কয়েকবার বকাবকি বা বারণ করার পরও মা যখন দেখতো কাজ হচ্ছে না, তখন মার দেওয়ার পালা। দিদি মেয়ে বলে বেশীরভাগ সময়ই বেঁচে যেতো, মারটা আমার কপালেই জুটতো। তারপর কিছুক্ষণ পিনপতন নীরবতা। আর তার কিছুক্ষণ পর দিদি বলতো "এ নে ভাই, তোর দিকেই হারিকেন টা বেশি ঘুরিয়ে দিলাম"। এমন একটা পারিবারিক বন্ধনে বড় হয়েছিলাম যে দিদির ওই কথায় রাগের বদলে আমার আনন্দই হতো। আসলে ভালোবাসা সহজাত, ওটা শেখাতে হয় না। ঘৃণার ঠিক উল্টো! হারিকেন জ্বালালে একটা হাল্কা কেরোসিন তেলের গন্ধ পাওয়া যেতো। সেই চেনা গন্ধ আজ একদমই অচেনা হয়ে গেছে।
অন্ধকারের একটা সীমানা আছে। হারিকেনের আলোয় পড়বার সময়ে বোধহয় অজান্তেই মনের ভেতর সেই সীমানা পেরোনোর একটা ইচ্ছে গেঁথে গিয়েছিলো। হারিকেনের পাঠ তো কবেই চুকেছে। আজ চারিদিকে বড্ড আলো। কারেন্ট চলে গেলেই লেড্ আলোর এর্মাজেন্সী, টর্চ। তার ওপর একাধিক মোবাইল ফোনের টর্চের আলোর তীব্রতায় চোখ ধাঁধিয়ে ওঠে। স্পষ্ট দেখবার বদলে কেমন যেনো ঝাপসা দেখি সবকিছু। সেই ঝাপসা চোখে নিজের ঘরে বসে জানালা দিয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে শুধু মনে হয় - "কি জানি কিসের লাগি, প্রাণ করে হায় হায়"। সুসভ্যতার আলোর বদলে যদি কেউ সেই অন্ধকারটা আবার ফিরিয়ে দিতে পারতো!

সুমন সিনহা
পুণে, ১০/০৯/২০২২

পুনশ্চ: নিচের ছবিটি আমাদের বড় ঘরে তোলা। যতদূর মনে পড়ে আমি তখন ক্লাস ফাইভ আর দিদি তখন ক্লাস এইট।


Saturday, February 5, 2022

সরস্বতী পুজো - হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো

কোনো কোনো দিন বড় স্মৃতিমেদুর করে তোলে। আজ সরস্বতী পুজো। ভালোবাসার বসন্ত পঞ্চমী। আজকের দিনটি  আমায় অতীতচারী করে তোলে। মফস্বল শহরের সরস্বতী পুজোর দিন মানেই কত রোমাঞ্চকর অনুভূতি... বাড়ির বাইরে থাকার অগাধ স্বাধীনতা। পাড়ার পুজো, স্কুলের পুজো, অন্য স্কুলে ঠাকুর দেখতে যাওয়া, কুল খাওয়ার মজা -- একটার পর একটা। আড়ম্বরহীন পুজোয় অনাবিল আনন্দের অনুভূতি, অকারণ হাসির দিনগুলি আজ চেষ্টা করেও ফিরে পাই না। একটু বড় বয়সে মেয়েদের হলুদ শাড়ি, সাজগোজ, ক্ষেত্রবিশেষে বাঁকা চাহনি, মুখ টিপে হাসি, বন্ধুদের প্রপোস, কারোর কারোর নিরালায় উষ্ণতা বিনিময় ও আমাদের পাহাড়া দেওয়া (কখনো কখনো আড়ি পাতাও বটে! ) -- এসবই এক মনখারাপ করা অদ্ভূত ভালোলাগার সৃষ্টি করে। অকৃত্রিম সারল্যের সেই গলাগলির দিন গুলোই বোধহয় জীবনের সবচেয়ে বড় পাওনা। সঞ্চয়ও বটে। বছর দুয়েক আগে নিছকই খেয়াল থেকে নিচের কবিতা টি লিখেছিলাম। আজ আরো একবার ভাগ করে নিই।

খেয়াল

দুপুর বেলায় হঠাৎ খেয়াল হলো 
ঘুরে আসি সব পুরোনো অলি গলি 
অবক্ষয়ের পঁচিশ বছর পর 
কেমন আছে ফেলে আসা দিন গুলি। 

রোজ বিকেলে আড্ডা দেওয়ার নেশা 
ছুটে যেতাম তোদের বাড়ির ছাদে 
কখনো সেই কোণের ঘর টা তে 
সময় যেতো নিজের মনে বয়ে। 

ঘড়ি দেখার ছিল না কোনো বালাই 
রেশারেশির ছিল না কোনো লড়াই 
লাভ ক্ষতি তে ছিল না যে বিশ্বাস 
শুধু তুই আর আমি, আর ওই ছাদ। 

না ছিল ফোন, না কিছু ভেবে 
দিতিস উঁকি আমার ঘরে 
বলতিস তুই এক গাল হেসে 
চল ঘুরে আসি গঙ্গার ধারে।

দুটো সাইকেল পাশাপাশি চলে 
উৎসাহী লোক চোখাচোখি করে 
আমরা দুজন নির্বিকার 
চষে ফেলি সব রাস্তা ঘাট। 

ছিল না কোনো হিসেবনিকেশ 
ছিল না কোনো বিধিনিষেধ 
চেনা গন্ডির মধ্যে থাকা, ছিল স্বতঃসিদ্ধ
কাঁচা বয়সের দুটি কচি মন, শুধু অপাপবিদ্ধ।

সুমন সিনহা 
০৫/০২/২০২২


Monday, May 24, 2021

The Visionaries: Three Indian filmmakers with global relevance

Last Sunday I attended one webinar on "The Visionaries : Three Indian filmmakers with global relevance" organized by Kalapriya Centre for Indian Performing Arts. I am lucky that I got a free ticket for attending the same. It was awesome and mind blowing. I am enriched and enlightened. The conversation was recorded by the organisers and I would like to share with you the link of that. It is worth listening.

Suman Sinha

23/05/2021

Click to listen: The Visionaries: Three Indian filmmakers with global relevance



Monday, April 26, 2021

বড়দিনের ডায়েরি

গতকাল বড়দিন চলে গেলো। আজকাল যে কোনো উৎসব এলেই কেমন একটা বিষণ্নতা বোধ হয়। উৎসব উদযাপনে অংশগ্রহণ করলেও কেমন একটা অপূর্ণতা থেকে যায়, কিছু একটা না পাওয়ার ব্যাপার অনুভূত হয়। অনেকটা ওই 'কি জানি কিসের লাগি, প্রাণ করে হায় হায়'। এবারে এই প্যান্ডেমিক ক্লান্ত বড়দিনে ঘরের মধ্যে সপরিবারে ছুটি ও উৎসব উদযাপন করতে করতে সেই অনুভূতি আরো প্রকট হল। নিজেকে মাঝে মাঝে কিছুটা বিচ্ছিন্নও মনে হলো।

আমার পুত্রের বয়স ছ'বছর। স্বভাবতই ওর উৎসাহ ও উদ্দীপনা অনেক বেশি। তার কারণও ভিন্ন। বাড়িতে একটা ক্রিসমাস ট্রী আছে। সেটাকে বের করে ঝাড়পোষ করা, তাকে ডেকোরেট করা, তারপর তার মধ্যে টুনি (লেড) লাইট লাগানো - এসবে ওর উত্তেজনার শেষ নেই। উপরিপাওনা হিসেবে এবারে ওর বিগদাদা আবার বিভিন্ন রঙের লেড লাইট জ্বলা একটা বেলুনও দিয়েছে। তাই উত্তেজনার পরিমাণও একটু বেশী এবারে। বিভিন্ন ভাষায় জিঙ্গিল বেল চালিয়ে ওর লাফালাফি, দাপাদাপি করা - এসব দেখতে বেশ ভালোই লাগছিলো। প্রাণের স্পন্দন দেখতে কার না ভালো লাগে। সকালবেলা কেক কাটাও হয়েছিলো।

কেক কাটার সময়ই ছোটবেলার কেককাটার স্মৃতি মনে এলো। আসলে এখন যে কোনো উৎসবের সময়ই আমাদের ছোটবেলার উৎসব যাপনের দিনগুলো মনে পড়ে যায় এবং অবধারিত ভাবে একটা তুলনা চলে আসে। আমার ছোটবেলার বড়দিন পালনের প্রধান অংশ ছিল সকালবেলা কখন কেক কাটা হবে আর মা বিকেলে কখন চার্চে নিয়ে যাবে। তখন বছরে ওই একদিনই কেক আনা হতো বাড়িতে। দু একবার ছাড়া কখনো আমার জন্মদিন পালন করা হয়নি আর জন্মদিনে কেক কাটার রেওয়াজ ছিল না। এখন তো সারাবছরই কেক পাওয়া এবং খাওয়া যায়। সহজলভ্যতা যে কোনো জিনিসেরই গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। তাই বড়দিন কে ঘিরে বছরে একবার কেক কাটার যে একটা রোমাঞ্চ ছিল, সেই রোমাঞ্চ কোথায় হারিয়ে গেছে। আমার ছেলের মধ্যেও কেক কাটার আলাদা কোনো উত্তেজনা নেই। ওর কাছে কেক খাওয়াটা শুধু প্রাতঃরাশ ছিল।

আমাদের ছোটবেলায় সান্তাক্লজের নামটাম বিশেষ শোনা যেতো না। জিঙ্গিল বেল আমি শুনিনি। ক্রিসমাস ট্রী'র ফান্ডা জানা ছিল না। আর মোজার ভেতর সান্তাবুড়ো এসে উপহার সাজিয়ে দিয়ে যাবে - এমন রূপকথার জীবনে বড় হই নি। মেরি ক্রিসমাস উইশ করার বাতিক বা ফর্মালিটিও আমাদের বা বড়দের মধ্যে ছিল না। আমাদের মূল আকর্ষণ ছিল বড়দিনের তিন চার দিন আগে থেকে দোকানগুলোয় রঙিন কাগজে মোড়া বিভিন্ন রকমের কেক সাজানো দেখা। সেই দেখাতেই কি ভীষন খুশী আর আনন্দ। আর বাবার কাছে আব্দার ছিল কেক কিনতে যাওয়ার সময় যেনো আমাকে দোকানে নিয়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল আরও কাছের থেকে রঙিন কাগজে মোড়া কেকগুলোকে দেখা। কিনবার পছন্দ আমার বা দিদির ছিল না। বাবা বা মা দাম অনুসারে যা কিনবেন সেটাই আমাদের আনন্দের কারণ। শুধু কেনার পর মনে হতো ইশ্ আরেকটু বেশি দাম দিয়ে যদি ঐ কেক টা কিনতো! কিন্তু শুধু মনেই, বলতে পারিনি কোনোদিন মুখে। এবারে যখন ছেলে কে বললাম যে চল্ কেক কিনে আনি, ওর সরল উত্তর ছিল 'বাড়িতেই তো মাইক্রোওয়েভ ওভেন আছে, ওখানে তো মাম্মা কেক বানায় প্রায়ই - বাইরে থেকে কেক কিনতে যাবে কেনো?' ওর এই সহজ উত্তরের মধ্যে ওর অজান্তেই কোথাও একটা প্রাচুর্যতার ইঙ্গিত আমাকে নাড়া দিয়েছিলো। জানিনা এটাকে 'rising of the proletariat' বলা বা ভাবা যায় কিনা! এখন তো উৎসব মানেই প্রাচুর্যতা ও দেখনদারি।আর ছিল বিকেলে মায়ের হাত ধরে আমার আর দিদির চার্চে যাওয়া। সেটাই ছিল বড়দিনের প্রধান আকর্ষণ। মফস্বল শহরের সাদামাটা চার্চ সেদিন আলোয় সেজে উঠত। ভেতরে মেরি মাতা ও যীশুর মূর্তি ও ছবি, মাটির তৈরী মেষশাবক, আলো দিয়ে তারা সাজানো - এসব অপলক মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখতাম। মা যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার গল্প বলতেন, আমরা শুনতাম। বাড়ি ফিরতে মন চাইতো না। মা তাড়া দিলে বলতাম আর একটু, আর একটু। ভিড়ের মধ্যেও ঐ মেষশাবক গুলোকে বারবার দেখে যেতাম। মেরিমাতার কোলে যীশুকে দেখে একটা অদ্ভূত ভালোলাগা কাজ করত। চলে আসার সময় মনে হতো আবার একবছর পর এই চার্চে আসতে পারবো। কখনো আমাদের কে বলা হয়নি যে আমরা কোনও ধর্মীয় স্থানে যাচ্ছি। সেই বোধটাই কখনো আসেনি। ঠিক যেমন বড়দিনের কেক খাওয়ার সময় কখনো মনে হয়নি সেকুলার প্রমাণ করার জন্য কেক খাচ্ছি, সেমাইয়ের পায়েস বা বিরিয়ানি খাওয়ার সময়ও কখনো মনে হয়নি। উৎসবের আমেজ, উৎসবের মেজাজ, উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়াতেই উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব নিহিত থাকে। ধর্মীয় সঙ্কীর্নতা উৎসবের প্রকৃতি বা চরিত্রের ওপর থাবা বসালে বিষণ্ণতা আসে না? আজকাল যে কোনো উৎসব কে ঘিরেই একটা সমান্তরাল ধর্মীয় প্রচার ও উস্কানি লক্ষ্য করা যায়। সময়ের সাথে উৎসব পালনের ধরন বা রকম বদলাতেই পারে, তাই বলে উৎসবের আবেদন কি পাল্টে যেতে পারে?

এসব নানান কথা ভাবতে ভাবতেই দুপুর গড়িয়ে বিকেলও চলে গেলো। শীতের বিকেলের স্থায়িত্বই বা কতটুকু! সন্ধেবেলা পুত্রের দাবি বা আব্দারে ওর পুণের জেঠু, জেম্মা ও বিগদাদা এলো। পিকুর সম্মানে আরো একবার ওদের আনা কেক কাটা এবং খাওয়া হলো। একসাথে বেশ কয়েকটি ফটোও তোলা হল। ফটো তোলাও এখন কত সহজলভ্য! ছোটোবেলার বড়দিনের কোনো ফটো ফ্রেমবন্দী নেই। ওরা চলে যাওয়ার পর সেই আক্ষেপ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আবিষ্কার করলাম যে ২৫শে ডিসেম্বর নাকি 'গীতা জয়ন্তী'। এর আগে কখনো জানতাম না। আমার প্রিয় শহরের যে চার্চ নিয়ে এত স্মৃতি, সেই চার্চের সামনেই কিছুজন 'গীতা জয়ন্তী' উপলক্ষে 'গীতা বিতরণ কর্মসূচি' তে অংশগ্রহণ করে 'বড়দিন' পালন করেছেন! চার্চের সামনে ছাড়া অত বড় শহরে আর জায়গা ছিল না গীতা বিতরণ করার! এই আপাত 'ছোট্ট ঘটনা' টি সারাদিনের সুখানুভূতি গুলোকে একটা না-বোঝাতে পারা মনখারাপে ঢেকে দিলো। সেই বিষন্নতা ও গীতাপ্রাপকরা গীতা পড়বেন এই আশা নিয়ে প্রার্থনা করলাম বড়দিন শুভ বোধের হোক, বড় মনের হোক।

শুতে যাওয়ার সময় মহীনের ঘোড়াগুলি'র একটা প্রিয় গান শুনতে বড় ইচ্ছে হলো। তারই তিনটি লাইনের রেশ নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি দিলাম...

"তবুও কিছুই যেনো ভালো যে লাগে না কেনো 
উদাসী পথের মাঝে মন পড়ে থাকে যেনো 
কোথায় রয়েছে ভাবি লুকিয়ে বিষাদ তবুও।" 

সুমন সিনহা
২৬/১২/২০২০

Sunday, April 18, 2021

নাহুম এন্ড সন্স - কলকাতার পরম্পরা

 

পরশু হঠাৎ মনে হল অনেকদিন ধর্মতলা চত্বরে যাওয়া হয়নি। বিকেল চারটে নাগাদ বউ আর ছেলে কে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। মেট্রো থেকে নেমে কিছুটা হেঁটে ওবেরয় গ্র্যান্ডের পাশের রাস্তাটা দিয়ে সোজা গিয়ে ঢুকে পড়লাম নিউ মার্কেটে। ভিড়ের মধ্যে ছেলের হাত ধরে বকবক করতে করতে অনেক পুরোনো স্মৃতিই মনে পড়ছিল। লাইটহাউস তো আর নেই। সেখানে বারিস্তা আর ডোমিনিজ পিৎজার গ্লো-লাইটের ঔজ্জ্বল্য সত্যিই আমার চোখে লাগছিল। সে যাই হোক ছেলে কেক খেতে খুব পছন্দ করে। নিউ মার্কেটে ঢোকার সময়ই ঠিক করেছিলাম ওকে নাহুমসের কেক খাওয়াবো। সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নাহুমস কলকাতার ইতিহাস ও ট্রাডিশনকে আজও ধরে রেখেছে। তাই সেখানে যাওয়ার লোভ আমারও ছিল। এ সব ব্যাপারে বউ এর সাথে সামান্য একটু মিলও আছে!!এখন নাহুমসের বয়স 117 বছর। 1902 সালে বাগদাদী ইহুদী নাহুম ইজরায়েল মোর্দেকাই (Nahoum Israel Mordecai) এই বেকারী প্রতিষ্ঠা করেন। উনি প্রথমে door-to-door মডেলে ব্যবসা শুরু করেন। স্বাদ ও গুনগত মানের জন্যে অচিরেই নাহুমস ঔপনিবেশিক শাসকদের মন জয় করে ফেলেন। তারপর 1916 সালে নিউ মার্কেট এলাকায় উনি এই eponymous দোকানটি খোলেন। এখনও অবধি সেই একই জায়গায় দোকানটি আছে। সেই পুরোনো সেগুন কাঠের আসবাবপত্র, কাঁচের শোকেস্, এমনকি ফ্লোরিং কিছুই পরিবর্তন হয়নি। কিছুদিন আগে পর্যন্ত কার্ড পেমেন্টও ছিলনা!! কেকের পুরোনো ও আসল স্বাদ ধরে রাখতেও নাহুমস অদ্বিতীয়। সাম্প্রতিক কালে ফ্লুরিজ নতুন মেক-ওভার নিয়ে বেশ কিছু ব্রাঞ্চ যেমন খুলেছে অথবা তুলনামূলক ভাবে নতুন কুকিজার বা মিসেস ম্যাগপি যে আধুনিকতা নিয়ে এসেছে, নাহুমস সচেতন ভাবে পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছে। এখানেই নাহুমসের নিজস্বতা। কাঠের ক্যাশবাক্স আজও আছে। 2013 সালে তৃতীয় প্রজন্মের মালিক নিঃসন্তান ডেভিড নাহুম মারা যাওয়ার পর যে আশঙ্কার মেঘ তৈরী হয়েছিলো, নাহুম পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও নিষ্ঠাবান কর্মচারীদের দৌলতে 'নাহুম এন্ড সন্স' এখনও একই রকম জনপ্রিয়। একশো বছর ধরে কলকাতাবাসী কে প্রিয় কেক উপহার উপহার দেওয়ার জন্য নাহুমস কে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
ফটো courtesy : বর্তমান নাহুমস কর্তৃপক্ষ

সুমন সিনহা 
০৮/১১/২০১৯





জীবনানন্দ দাশ

আজ "নির্জনতম কবি"র মৃত্যুদিন। বিবরবাসী এই মানুষটির সোচ্চার স্বপ্ন ছিলো "কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে"। ভীষন ক্লা...